Sunday, December 11, 2016

নিম্ন তম জান্নাত পৃথিবীর১০গুন, বড়টি ?

                                                                                                                মুহাম্মাদ আলীরেজা                                                                                                                                                                                                                                                                                 মহাবিশ্ব প্রসারমাণ এ আবিষ্কারটি বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম বৌদ্ধিক বিপ্লবগুলোর অন্যতম। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা কি কখনো ভাবার সুযোগ পাই; ছায়াপথগুলো প্রতি সেকেন্ডে৭০ কিলোমিটারের  চেয়ে বেশি গতিতে দূরাপসরণ করছে?প্রত্যাশিত হিসাবের চেয়েও দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে মহাবিশ্ব। নাসা ও ইউরোপিয়ান স্পেস অ্যাজেন্সির দেয়া তথ্য অনুযায়ী,ধারণার চেয়ে ৫থেকে ৯ শতাংশ দ্রুতগতিতে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটে চলেছে।  ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে  ঘটা  বিগব্যাঙ থেকে পাওয়া বিকিরণ পরিমাপ করে যে হিসাব বের করা হয়েছিল, তার সাথে মিলছে না বর্তমানে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার। প্রসারণশীল মহাবিশ্বের এই অভিক্রিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনার উপমার মাধ্যমে সহজেই উপলব্ধি করা যাবে। রাস্তায় চলন্ত একটি গাড়ি যখন কাছে এগিয়ে আসে তখন এর ইঞ্জিনের শব্দের তীক্ষ্ণতা তীব্রতর হয় এবং গাড়িটি যখন কাছে এসে দূরে অপসারণ করে, তখন শব্দের তীক্ষ্ণতা নিম্নতর হয়ে থাকে। আলোকের তরঙ্গের আচরণও একই রকম। আলোকের স্পন্দাঙ্ক খুব বেশি সেকেন্ডে চার থেকে সাত লাখ মিলিয়ন। এর রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্পন্দাঙ্ক। আমাদের দৃষ্টিতে যা বিভিন্ন বর্ণ হিসেবে প্রতিভাত হয় সেগুলো হলো আলোকের বিভিন্ন স্পন্দাঙ্ক। সর্বনিম্ন স্পন্দাঙ্ক দেখা যায় বর্ণালীর লালের দিকে। তারকা যদি আমাদের দিকে আসে তাহলে প্রতি সেকেন্ডে আমরা যে স্পন্দাঙ্ক পাব তা বেড়ে যাবে, যেমনটি শব্দ শ্রোতার দিকে এগিয়ে আসার সময় ঘটে থাকে। অনুরূপভাবে তারকা যদি আমাদের কাছ থেকে দূরে অপসারমাণ হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের কাছে যে তরঙ্গগুলো পৌঁছাচ্ছে তার স্পন্দাঙ্ক হবে ক্ষুদ্রতর। তারকার আলোর স্পন্দাঙ্ক মেপে এর লাল বিচ্যুতি হলে স্পষ্টত বোঝা যাবে,তারকাগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরাপসরণ করছে।সূরা আযজারিয়ার ৪৭ আয়াতে নভোমণ্ডল প্রসারিত হচ্ছে উল্লেখিত হয়েছে :                                                                                               ‘নভোমণ্ডল নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে  এবং  আমি  অবশ্যই  মহাসম্প্রসারণকারী।’
এডউইন হাবল ১৯২৯ সালে প্রকাশ করেন যে, মহাবিশ্ব স্থিতাবস্থায় নেই। যে ছায়াপথটি যত দূরে অবস্থিত তার দূরাপসারণের গতিও তত বেশি। দেখা যায়এক মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ প্রতি সেকেন্ডে ২২`৪কিলোমিটার বেগে এবং দুই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ প্রতি সেকেন্ডে ৪৪`৮কিলোমিটার বেগে দূরাপসরণ করছে। অবাক বিস্ময়ের সাথে ভাবার বিষয়,বাস্তবে প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব আমাদের থেকে কত দূরে বিস্তৃতি লাভ করছে!আমরা ক’জন গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখেছি, প্রকৃত ঈমানের স্বাদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে সর্বশেষ বিজ্ঞানের নভোমণ্ডল ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে ন্যূনতম একটি ধারণা একেবারে না থাকলেই নয়? প্রশ্ন আসা স্বাভাবিকঈমানের  সত্যিকার স্বাদ পাওয়ার জন্য এসব তথ্য জেনে কী হবে? মুজাদ্দেদ ইমান গাজ্জালি রহ:সেই মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠইসলামি চিন্তাবিদ।বর্তমানে মহাকাশবিজ্ঞানের যে বিকাশ হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগে এই বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা কোন পর্যায়ে ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। সেই যুগে তার একটি উপমা এখানে তুলে ধরলে আমরা একেবারে চমকে উঠব! তিনি তার সময়ের এবং পরে সব কালের ঈমানদারদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন একটি উপমার মাধ্যমে, আল্লাহ পাকের প্রতি ঈমান সুদৃঢ় করার অতি সহজ একটি পথ। এটি হচ্ছেঈমানদারদের দৌড় শুধু মসজিদ নয়, বরং মহাকাশ বা মহাবিশ্ব সম্পর্কে যে ব্যক্তির কোনো ধারণাই নেই, তার ঈমানের স্বাদ বা স্তর  হচ্ছে একজন  Impotent (নপুংসক)-এর মতো, যার কোনো অনুভূতিই নেই নর-নারীর দৈহিক সম্পর্কের আসল মজা সম্পর্কে। বাস্তব দুনিয়ায় সবচেয়ে মজাদার,  অপার ফুর্তির  কোনো  কিছু থেকে থাকলে তা হচ্ছে একমাত্র এটি। তেমনি গাজ্জালি রহ:এর মতে, প্রকৃত ঈমানের আসল স্বাদ বা তৃপ্তি পেতে প্রয়োজন এবং পাওয়ার সহজ পথ হচ্ছে আল্লাহ পাকের অপার রহস্য মহাবিশ্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া। ঈমানদারদের তাচ্ছিল্য করে প্রচলিত কথায় বলে- ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ’! কিন্তু আমরা ক’জন  ওয়াকিবহাল,  সে সময়ে সমরকন্দ, দামেস্ক, কায়রো আর  করডোভায় প্রথম বড় বড়  মানমন্দির গড়ে তুলে আরব মুসলমানেরা।মুসলিম জ্যোতিবেত্তারা এমন সব  পর্যবেক্ষণ  চালিয়েছেন,যে সব১২বছরের ওপরে দীর্ঘায়িত হয়েছিল।সে সময়ের মুসলিম বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান কোন অবস্থানে পৌঁছেছিল তার বর্ণনা একটি ঘটনায় ফুটে ওঠে।সন্যাসী গারভাট (দ্বিতীয় সিলভেস্ট নামে তিনি ৯৯৯ সালে পোপ হন)  যখন  করডোভার মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে  লেখাপড়া শেষ করে খ্রিষ্ট ধর্মাচরণে পুনরায় ফিরে  এলেন  তখন লোকে বলে  , তিনি নাকি সেখানে শয়তানের সাথে দহরম  পর্যন্ত করে এসেছেন। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ স্থল।  এ স্থলভাগে  সাত শ’ কোটি মানুষ ছাড়াও রয়েছে কোটি কোটি জীবজন্তু,  পশুপাখি,ক্ষেতখামার, রাস্তাঘাট, পাহাড়পর্বত,বিশাল বিশাল মরুদ্যান, বনজঙ্গল ও আরো কত কী।  আর এত সবকিছু নিয়েই আমাদের আবাসভূমি পৃথিবী,যার বিশালত্ব কল্পনা করাও অনেক দুরূহ নয় কি? তাহলে রাতের আকাশের অগণিত তারকারাজিওছায়াপথ?                                                                    মহাকাশ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কিত বিজ্ঞানের সর্বশেষ খবর
আমাদের সূর্য একটি অতি সাধারণ তারকা। এর আকার তারকাগুলোর গড় আকারের মতোই।আমাদের বাসভূমির তারকা সূর্যের ব্যাস ১দশমিক ৪মিলিয়ন কিলোমিটা। এর অর্থ হলো ১০৯টি পৃথিবী সূর্যের পৃষ্ঠে সাজিয়ে রাখা যায়। এটি এত বড় যে, ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন পৃথিবীএর মধ্যে ভরে রাখা যায়। আমাদের সৌরগ্রহগুলো সূর্যের  চতুর্দিকে চাকতির মতো জায়গা জুড়ে আছে, যার দূরত্ব সূর্য থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন কিলোমিটার। একটি তারকার বর্ণনা যদি এমন হয়, সে ক্ষেত্রে মহাবিশ্বে তারকার সংখ্যা কত? বাস্তবে বিশাল সংখ্যার তারকা নিয়ে একটি ছায়াপথ। তাহলে মহাবিশ্বে তারকা ও ছায়াপথ আসলে কয়টি?  Kornreich মহাবিশ্বে ১০ ট্রিলিয়ন ছায়াপথ ধরে একটি রাফ হিসাব বের করেছেন- ছায়াপথের ১০০ বিলিয়ন তারকার সাথে  এই সংখ্যা গুণ   করলে হয় ১০০  অকটিলিয়ন (octillion) তারকা। তার মানে দাড়ায়, ১ এর সাথে ২৯টা শূন্ঃ১০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০।    Kornreich  জোর দিয়ে বলেন, এটা সাধারণ হিসাব,  তবে গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়,  মহাবিশ্বে ছায়াপথের সংখ্যা আরও বেশি। 13 October 2016 , NASA থেকে পাওয়া তথ্য হচ্ছে,দুই ট্রিলিয়ণ
  বা ২০ লাখ কোটি ছায়াপথ আছে মাত্র ১০শতাংশ মহাবিশ্বের মধ্যে। কিন্ত ছায়াপথগুলোর ৯০ শতাংশর   খোজ এখনও বাকি। ছায়াপথ হচ্ছে এমন একটি সিসটেম যেখানে মিলিয়ন থেকে বিলিয়ন সংখ্যক তারা মাধ্যাকষনের টানে এক সাথে আটকে থাকে। গানিতিক মডেল  ব্যবহার করে জ্যোতিবিজ্ঞানীরা ‘অদৃশ্যমান’ ছায়াপথগুলোকে শনাক্ত করার চেষটা করছেন । কেননা এই সব ছায়াপথ টেলিস্কোপের আওতায় আসে না।সেখান থেকে ই ধারনা করা হচ্ছে, মানুষের ধারনারও বাইরে রয়ে গেছে আরও লাখ লাখ ছায়াপথ। সূত্রঃ গার্ডিয়ান।তার মাণে দাড়ায় মহাবিশ্বে ২০ ট্রিলিয়ণ ছায়াপথও ছাড়িয়ে  যেতে পারে!   আবার দেখা যায়  সবচেয়ে বড় তারকাগুলো সূর্যের চেয়ে পাঁচশ’ গুণ শুধু বড় নয়,  সেই সাথে  এক লাখ গুণ  বেশি উজ্জ্বল।   ছায়াপথের কেন্দ্রে  অবস্থিত যে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল  তার ভর তিন মিলিয়ন সূর্যের সমান হয়ে থাকে।  আপনি যদি প্রতি সেকেন্ডে একটি করে  তারকা  গণনা করেন,  সে ক্ষেত্রে এই হারে সব তারকা গুনতে পাঁচ হাজার বছর লাগবে। ছায়াপথগুলো মহাকাশে এলোমেলোভাবে ছড়িয়েছিটিয়ে  না থেকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে  একে  অপর থেকে  বহু দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করে। সব ছায়াপথ এক করলে তারা মহাশূন্যের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ স্থান দখল করবে, যার অর্থ দাঁড়ায় বাস্তবে মহাশূন্য এত  বিশাল যে, বিজ্ঞানের সুপার কল্পকাহিনী পর্যন্ত   এর আওতার আনেক বাইরে।                                    
                                        ছায়াপথ কত বড়?
এত বড় যে, বড় ধরনের ছায়াপথের আড়াআড়ি দূরত্ব এক মিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি হবে [এক বছরে প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার মাইল বেগে যে দূরত্ব অতিক্রম করা যায়, সেটি হলো এক আলোকবর্ষ (৯দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।)] আমরা এমন  একটি ছায়াপথে থাকি, যেটা আড়াআড়ি মাপে  প্রায় এক লাখ  আলোকবর্ষ। আমাদের ছায়াপথটি ধীর গতিতে ঘূর্ণায়মান। এর সর্পিল বাহুগুলোতে অবস্থিত তারকাগুলো প্রায় কয়েক শ’ মিলিয়ন  বছরে একবার করে কেন্দ্রকে  প্রদক্ষিণ  করে। সবচেয়ে ছোট ছায়াপথের নাম ডর্ফ, যার প্রশস্ত  কয়েক হাজার আলোকবর্ষের দূরত্বের। অ্যান্ড্রোমেডার ছায়াপথটির এক প্রান্ত থেকে অপর  প্রান্তের দূরত্ব হবে দুই লাখ ৫০ হাজার আলোকবর্ষ। মজার বিষয় হচ্ছে, এই মুহূর্তে মহাবিশ্বের দিকে তাকালে দূর অতীতের মহাবিশ্বকে আমরা আসলে কিন্তু দেখতে পাবো, কেননা এই সময়ে দূর তারকা ছায়াপথ থেকে আলো এসে কেবল আমাদের কাছে পৌঁছেছে। যে কোয়সারগুলো এখন আমরা দেখছি, সেই আলো আমাদের কাছে পৌঁছতে শত শত কোটি বছর লেগে গেছে। আমাদের নিকটতম তারকা Proxima Centauri থেকে আলো আসতে লাগবে  ৪ দশমিক ৩ বর্ষ।     যুক্তরাষ্ট্রের একটি সর্বাধিক বিক্রীত ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের বই ‘অ্যা হিস্ট্রি অব গড’ পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে‘কুরআন পাকে সব সময়ই বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে  আল্লাহ পাকের নিদর্শন বা বাণীর (আয়াত) রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য। আর এ কারণে ইসলামের অনুসারীরা যুক্তি ও কারণকে এড়িয়ে না গিয়ে গভীর মনোযোগ এবং বিশেষ কৌতূহলের সাথে পৃথিবীর সব কিছুকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পরে দেখা যায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে(ন্যাচারাল সায়েন্স)মুসলমানদের এক উৎকৃষ্ট ঐতিহ্য গড়ে তোলার, যা কখনো বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের বিরোধ বা সংঘর্ষ ঘটায়নি,খ্রিষ্টান ধর্মের ক্ষেত্রে যেটা দেখা গেছ।কাজেই মহাবিশ্বের সব কিছুকে পর্যবেক্ষণ ও রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমেই কেবল আল্লাহকে খুঁজে পাওয়া ও তার নৈকট্য লাভ করা যেতে পারে।  ঈমান বাড়ানোর পথ বা উপায় হলো  সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গভীরভাবে  চিন্তাভাবনা করা।হাদিসশরিফেআছেঃ  সৃষ্টিরহস্য নিয়ে কিছু সময় চিন্তাভাবনা করা, সারা রাত নফল এবাদত থেকেও উত্তম। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভাষায়: ‘নিশ্চয়ইএর পেছনে রয়েছে এক অকল্পনীয় মহাজ্ঞানী সত্তার এক রহস্যময় অভিপ্রেত।বিজ্ঞানীর দুরভিসারি জিজ্ঞাসা সেখানে বিমূঢ়  হয়ে যায় বিজ্ঞানের সমাগত  চূড়ান্ত অগ্রগতিও সেখান থেকে স্তব্ধ হয়ে ফিরে আসবে; কিন্তু সেই অনন্ত মহাজাগতিক রহস্যের প্রতিভাস বিজ্ঞানীর  মনকে এই নিশ্চিত  প্রত্যয়ে উদ্বেল  করে তোলে,  এই মহাবিশ্বের একজন নিয়ন্ত্রা রয়েছেন। তিনি অলৌকিক জ্ঞানময়, তাঁর সৃষ্টিকে অনুভব করা যায় কিন্তু তাকে কল্পনা করা যায় না।’ যে ছায়াপথটি যত দূরে অবস্থিত তার দূরাপসারণের গতিও তত বেশি। প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব কত বিস্তৃতি লাভ করছে! আবার যেহেতু সব ছায়াপথ মহাকাশের  দশ লাখ ভাগের মাত্র এক ভাগ জায়গা দখল করে আছে, সে ক্ষেত্রে ১০ পৃথিবীর সমান নিম্নস্তরের জান্নাত হওয়াটা একেবারে সাধারণ ঘটনা। ‘নিশ্চয়ই এর পেছনে রয়েছে এক অকল্পনীয় মহাজ্ঞানী সত্তার এক রহস্যময় অভিপ্রেত।’ আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলেছেন, "আল্লাহ্‌ পাক বলেন - জান্নাতে এমন নেয়ামত তৈরী করে রেখেছি যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান যার কথা শোনেনি, এবং কোন মানুষের কল্পনায়েও যা আসেনি।" জান্নাতে অসুস্থ্যতা ও বার্ধক্যতা নেই, চির যৌবন লাভ করবে জান্নাতবাসীরা, রাসুলুল্লাহ (দঃ) একদিন বলেন, "বৃদ্ধদের জান্নাতে দেখা যাবে না।" নিকটে অবস্থানরত এক বৃদ্ধা এ কথা শুনে কেঁদে ফেললেন। যখন তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন, "আমি বৃদ্ধা হয়ে গেছি। আগে যদি মারা যেতাম, জান্নাত লাভের সৌভাগ্য হত।" তাঁকে আশ্বস্ত করে রাসুল (সাঃ) বললেন, "জান্নাতবাসী সকলেই চির যৌবন লাভ করবে, অতঃএব ভয়ের কিছু নেই।"    সবচেয়ে নিম্ন স্তরের জান্নাতের আয়তন হবে দশ পৃথিবির সমান। আর বড়টি কত বড় হবে তা মহাবিশ্ব নিয়ে  একটু চিন্তা  করলে  সবার কাছে একেবারে  পরিষ্কার হবারই  কথা ।   
 [ লেখাটি নয়াদিগন্ত    ও মুনা (Muslim Ummah of North America)  বুলেটিনে    প্রকাশিত  ]                                                                                            লেখক : সাবেক  পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





Friday, December 9, 2016

আজকের প্রচলিত বিজ্ঞানের উদ্ভাবক কি ইসলাম?

     আজকের প্রচলিত বিজ্ঞানের উদ্ভাবক কি ইসলাম?

                                                                                                       মুহাম্মদ আলী রেজা
  গ্যালিলিও গ্যালিলি ও কোপার্নিকাসের মতো বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরা চার্চের কোপানলে পড়লে এর দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়ে যায়, আর বুঝি ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান কোনো অবস্থাতে সম্ভব নয়। প্রচলিত বিশ্বাস আরো প্রবলভাবে পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। অন্ধ বিশ্বাস আর বস্তাভর্তি উপাখ্যান নিয়ে ধর্মের সৌধ, পক্ষন্তরে বিজ্ঞানের ভীত তৈরি হয় অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষ।, গবেষণা, যুক্তি, প্রমাণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞান হচ্ছে বর্তমান জগতের কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য নিবেদিত।  ধর্ম শুধু তথাকথিত পরকাল নিয়ে আছে আর এই পরকালের কাল্পনিক স্বপ্ন দেখে থাকে। এসব যুক্তি ও ধারণা থেকে বলা চলে, এ দুয়ের সম্পর্ক পরস্পরবিরোধী এবং সাংঘর্ষিক হওয়া স্বাভাবিক। ঐতিহাসিক প্রোপট এবং প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসের পরও যদি বলা হয় বা দাবি করা হয়, বিজ্ঞান বলতে বর্তমান সময়ে আমরা যেটাকে বুঝি সেই বিজ্ঞানের উদ্ভাবক একটি ধর্ম, তাহলে ব্যাপারটি আজগুবি বা ভৌতিক গল্প বলে মনে হওয়ার নয় কি? এরপরও কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, আজকের বিজ্ঞানের উদ্ভাবক একটি ধর্ম আর এই ঐতিহাসিক রেকর্ডটি সংরতি রয়েছে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঠাগার ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’-এ। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবে আদিতে বিজ্ঞান বলতে শুধু পদার্থবিজ্ঞানকে বোঝানো হতো। বর্তমানেও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র তত্ত্ব এবং আবিষ্কৃত কলকব্জা, যন্ত্রপাতি ব্যতিরেকে বিজ্ঞানের অপরাপর শাখাগুলো বলতে গেলে হয় ভোঁতা, না হয় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে। বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, রোবট, ইন্টারনেট অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত সব কিছু প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে পদার্থবিজ্ঞানের ফসল বা অবদান। প্রাণ পদার্থবিজ্ঞান, ভূ-পদার্থবিজ্ঞান, মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি হরেকরকম নামকরণ থেকে সহজেই ধারণা নেয়া যায় মূল বিজ্ঞান পরিবারে পদার্থবিজ্ঞানের অবস্থান তার কেন্দ্রবিন্দুতে হবে। আমি চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিকতা করেছি, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয় জন্স হপকিন্সে প্রাণ পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করেছি, কিন্তু কোথাও শুনিনি, দেখিনি, পাইনি পদার্থবিজ্ঞানের উদ্ভাবক একটি ধর্ম! বিশ্বের সচেতন এবং অভিজ্ঞ মহল অবগত যে রসায়ন, গণিত এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রে ইসলামের অনুসারীরা অভূতপূর্ব যুগান্তকারী অবদান রেখেছে; কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের উদ্ভাবক ইসলাম ধর্ম এ রেকর্ডটি কোথায় লিপিবদ্ধ রয়েছে তা দেখার জন্য লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে ঘুরে আসা যেতে পারে।
দুই শ’ বছরেরও বেশি পুরনো বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী এই পাঠাগারের সব বই ওয়াশিংটন-ডিসির তিনটি ভবনে সংরক্ষত। ১৮৯৭ সালের জেফারসন ম্যাগনিফিসিয়েন্ট ভবনটি শুধু দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। প্রথমতলায় স্থায়ীভাবে প্রদর্শনীর মধ্যে রয়েছে  World famous : The Giant Bible  & The Giant Bible of Maing। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের বিশাল সংগ্রহশালার মধ্য থেকে ২০০টি ঐতিহাসিক পুস্তক ভবনটির দ্বিতীয়তলার ট্রেজারি গ্যালারিতে সংরক্ষতি রয়েছে। এই তলার মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ। গম্বুজের মধ্যে একেকটি চিত্রের নিচে একেকটি দেশের নাম। ব্যতিক্রম চোখে পড়ল এত দেশের মধ্যে এক স্থানে শুধু একটি ধর্মের নাম। কোন দেশ কী উদ্ভাবন করেছে, সেটি গাইড আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। দেশের নামের বদলে যে চিত্রের নিচে ‘ইসলাম’ লেখা ছিল, সেটি দেখিয়ে গাইড আমাদের বললেন, এটার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের উদ্ভাবন করেছে ইসলাম ধর্ম। এ সময়ে বাল্টিমোরে আইসিএনএ (ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা)-র বার্ষিক সম্মেলন চলছিল। প্রফেসর রাও-এর লেখা, ‘মুহাম্মদ দ্য প্রফেট অব ইসলাম’ বইটি হাতে পাই। লেখকের বর্ণনা মতে, রবার্ট ব্রিফল্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য মেকিং অব হিউম্যানিটিতে অনেক উদাহরণ পরিবেশন করে সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে  ‘আমাদের বিজ্ঞান আরব মুসলমানদের কাছে ঋণী শুধু এতটুকুর জন্য নয় যে, বিজ্ঞানকে তারা কেবল চমকপ্রদ আবিষ্কার অথবা বৈপ্লবিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব উপহার দিয়েছে। বিজ্ঞান আরবির সংস্কৃতির কাছে আরো অনেক বেশি ঋণী। বিজ্ঞান তার নিজের অস্তিত্বের জন্য ঋণী।’ এই একই লেখক কথাটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, গ্রিকরা নিয়মাবদ্ধ ও সার্বজনীন করা এবং তত্ত্ব সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেয়ার পথ বাতলে ছিল, কিন্তু ধৈর্য ধরে গবেষণার পদ্ধতি, সন্দেহাতীত জ্ঞানকে পুঞ্জীভূতকরণ, বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষদ্র ব্যাপারেও বিশদ পরীক্ষণ পদ্ধতি, বিস্তারিত ও দীর্ঘ প্রসারিত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষ।মূলক অনুসন্ধান এসবই গ্রিক মানসিক ধাত বা মেজাজে ছিল বহিরাগত। আমরা যেটাকে আজ বিজ্ঞান বলি, তার উত্থান ইউরোপে হয়েছিল নতুন পদ্ধতি গবেষণার ফলে এবং পরীক্ষা , পর্যবেক্ষণ, পরিমাপন ও গণিত শাস্ত্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে পদ্ধতিগুলো গ্রিকদের কাছে অজানা ছিল।...
ইউরোপকে আরবীয় মুসলমানেরা এসব মূলনীতি ও পদ্ধতিগুলো পরিচয় করিয়ে দেয়।’ রবার্ট ব্রিফল্ট যেসব উদাহরণ থেকে এই মন্তব্যে পৌঁছেছেন সে সবের মধ্যে রয়েছে : মুসলিম উদ্ভিদবিদ্যাবিদ ইবনে বতুতা বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করে যে গ্রন্থ লিখেছেন সেটিকে Mayer তার The Geschder Botanika তে অধ্যবসায়ের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেন। অপর দিকে আল বিরুনি ৪০ বছর ভ্রমণ করেছিলেন মানিকবিদ্যা সম্পর্কিত (মিনারোলজি) নমুনা সংগ্রহের জন্য এবং মুসলিম জ্যোতির্বেত্তারা এমন সব পর্যবেণ পর্যন্ত চালিয়েছেন, যেসব পর্যবেক্ষণ ১২ বছরের ওপরে পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়েছিল। পক্ষ।ন্তরে অ্যারিস্টটল পদার্থবিজ্ঞানের ওপর একটি বই লিখেছেন এমনকি একটি পরীক্ষ।  না চালিয়েই এবং প্রকৃতির ইতিহাসের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন একেবারেই নিশ্চিত না হয়ে, অসতর্কতার সাথে বর্ণনা দিয়ে  প্রাণীদের চেয়ে মানুষের অর্ধেক দাঁত রয়েছে যে তথ্য অতি সহজেই অনুসন্ধান করা যেত। গ্যালেন, যিনি কাসিক্যাল অ্যানাটমির নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ, জানিয়েছিলেন যে নিচের চোয়াল দু’টি হাড় দিয়ে গঠিত। এই প্রতিবেদনটি শতাব্দী ধরে গ্রহণ করে নেয়া হয়েছিল একেবারে কোনো আপত্তি ছাড়াই, যখন পর্যন্ত না আব্দুল লতিফ একটু কষ্ট স্বীকার করে মানুষের কঙ্কাল পরীা করে সত্য-মিথ্যা যাচাই করলেন।
‘আমরা যেটাকে আজ বিজ্ঞান বলে জানি' - ‘দ্য মেকিং অব হিউম্যানিটি’ গ্রন্থের লেখকের এ উক্তিটির সাথে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের রেকর্ড, ‘আদি বিজ্ঞান তথা পদার্থবিজ্ঞানের উদ্ভাবক ইসলাম’ এ দু’টি বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্টত একটি যোগসূত্র লক্ষণীয়।
অন্যদিকে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, ধর্মের মূলমন্ত্র এবং পুঁজি হচ্ছে অন্ধবিশ্বাস। তাই যদি হয় তাহলে এই অন্ধবিশ্বাস কিভাবে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করেছে আজকের মূল বিজ্ঞানকে উদ্ভাবন করতে? এ প্রশ্নের জবাব মেলে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক বিক্রীত ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের বই ‘অ্যা হিস্ট্রি অব গড’ পুস্তকে, যেখানে বর্ণিত হয়েছে, ‘কুরআন পাকে সব সময়ই বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে আল্লাহ পাকের নিদর্শন বা বাণীর (আয়াত) রহস্য উদঘাটনের জন্য। আর এ কারণে ইসলামের অনুসারীরা যুক্তি ও কারণকে এরিয়ে না গিয়ে গভীর মনোযোগ এবং বিশেষ কৌতূহলের সাথে পৃথিবীর সব কিছুকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পরে দেখা যায় প্রকৃতিক বিজ্ঞানে (ন্যাচারাল সায়েন্স) মুসলমানদের এক উৎকৃষ্ট ঐতিহ্য গড়ে তোলার, যা কখনো বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের বিরোধ বা সংঘর্ষ ঘটায়নি, খ্রিষ্টান ধর্মের ক্ষ ত্র যেটা দেখা গেছে।
অতএব, স্পষ্টত ঐতিহাসিক বাস্তবতা বলছে, ধর্ম বিজ্ঞানবিরোধী এবং এ দুয়ে সহাবস্থান সাংঘর্ষিক, অন্যান্য ধর্মের সাথে এ ধরনের বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলেও ইসলামের ব্যাপারে এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত  সত্যিকার বিজ্ঞান বলতে আজ আমরা যেটাকে বলে থাকি এবং বুঝে থাকি, সেই আদি বিজ্ঞানের উদ্ভাবক ইসলামের অনুসারীরা। মুহাম্মাদ দ্য প্রফেট অব ইসলাম গ্রন্থে প্রফেসর রাও লিখেছেন, ‘কুরআন পাকে যতগুলো আয়াত মৌলিক ইবাদত সম্পর্কিত তার চেয়ে অনেক বেশি হবে সেই সম্পর্কিত আয়াত যেখানে আমন্ত্রণ করা হয়েছে প্রকৃতি/সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা, পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের। আরবীয় মুসলমানেরা এই প্রেরণায় প্রকৃতির রহস্য নিয়ে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ আরম্ভ করে দেয় যেটা বর্তমান সময়ের বৈজ্ঞানিক পর্যবেণ, পরীক্ষ। ও গবেষণার মূলনীতির ভিত্তি নির্মাণ করে, যা অজ্ঞাত ছিল গ্রিকদের কাছে।’
প্রচলিত আর একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস হচ্ছে, ধর্ম পালন করে শুধু পরকালীন জীবনের সুখ, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য। ইসলামে দুনিয়ার জীবনকে বাদ দিয়ে নয়, বরং উভয় জীবনের কল্যাণের জন্য কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ দুই জগতের কল্যাণ কামনা করে প্রার্থনা করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। এক সময় হজরত আলী রা:কে এক কুরাইশ নেতা বলেন, ‘পরকাল বলে কিছুই নেই। মৃত্যুর পর আর কিছু পাবে না। এখনই সব ভোগ করে নাও।’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আমার স্বাস্থ্য তোমার চেয়ে ভালো তা ছাড়া এই পৃথিবীতেও আমি তোমার চেয়ে সুখী। মৃত্যুর পর পরকাল যদি না থাকে সে ক্ষ ত্র তোমার যে অবস্থা আমারও একই। কিন্তু যদি পরকাল সত্যি সত্যি থাকে তবে আমি পার পেয়ে যাবো, তখন তোমার কী উপায় হবে ভেবেছ কী?’
মুজাদ্দেদ ইমাম গাজ্জালি রহ: লিখেছেন  ‘কোনো মুসলমান যদি প্রয়োজনীয় ধর্মীয় শিাক্ষা শেষে মানুষের কল্যাণ চিন্তা করে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করে, সে ধর্মীয় শিারই সওয়াব লাভ করবে।'পৃথিবীর মধ্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসীদের জন্য এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেওঃ' এ ধরনের আয়াতের প্রেরণায় মুসলামানেরা তাদের ইবাদতখানা পবিত্র মসজিদকেও বিজ্ঞান চর্চা ও অনুশীলনের জন্য ব্যবহার করেছে। 
বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৮৫৯ সালে একটি মসজিদের অংশ হিসেবে। মরক্কোর এই কারওয়াইন বিশ্ববিদ্যালয়টি হচ্ছে ইউনেসকো স্বীকৃত বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। গিনেস বুকের রেকর্ড অনুসারেও মরক্কোর ফেজ নগরীর কারওয়াইন বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। ফাতেমা নামে এক মহীয়সী নারী পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সব অর্থ ব্যয় করেন তার সমাজের লেখকগণের জন্য একটি মসজিদ তৈরির পেছনে। এই মসজিদ হয়ে ওঠে ধর্মীয় নির্দেশনা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোচনার স্থান। মসজিদটি পুরোপুরি নির্মাণে লেগে যায় ২৭৮ বছর। ইতালির ব্লোনায় (Blogna) যখন প্রথম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তারও আগে কারওয়াইন হয়ে ওঠে এক বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। ফেজকে তখন বলা হতো; ‘বাগদাদ অব দ্য ওয়েস্ট’।
বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে স্বনামধন্য আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মূলত আদিতে ছিল একটি মসজিদ। একটি মসজিদ হিসেবে এটির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু মসজিদ জ্ঞানচর্চার মূলকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো এটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে শেষে একটি বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
‘ইসলামের এক গৌরবময় কীর্তি হচ্ছে কুরআন, হাদিস ও মুসলিম বিধান শাস্ত্র ফিকাহর অধ্যয়ন অনুশীলনের অনুরূপ অন্যসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনাকেও সমান আসন ও মর্যাদা দিয়েছে এবং মসজিদের মধ্যেই তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’ পাশ্চাত্য চিন্তাবিদের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্টত উপলব্ধি করা যায় দুনিয়ার সুখ, কল্যাণের জন্য মুসলমানেরা কাজ করছে আর তার বিনিময়ে আখেরাতের কল্যাণ লাভে তারা সফল হবে। ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে মেকিং লাভের জন্য পুরস্কৃত হবে’ রাসূলুুল্লাহ সা:-এর কাছ থেকে এ কথা শোনার পর সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ‘যে কাজে আমরা সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি এবং মজা পাই তাতেও আমরা প্রতিদান পাবো?’ উত্তরে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘তোমরা যদি এটা অনির্ধারিত পন্থায় নিতে তাহলে কি সে জন্য শাস্তি পেতে না?’ জবাবে উপস্থিত সাহাবিরা যখন বললেন ‘অবশ্যই পেতাম’, শুনে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘তোমরা যে নির্ধারিত পন্থায় এটা উপভোগ করছো, সে জন্য তোমাদের পুরস্কৃত করা হবে।’ ইসলামে এমনকি জ্ঞানীদের ঘুমকেও ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
লেখক : সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

Thursday, December 8, 2016

বুশের টুইন টাওয়ার হামলার নেপথ্য রহস্য

                           বুশের টুইন টাওয়ার হামলার নেপথ্য রহস্য 
                                                                        মুহাম্মদ আলী রেজা

ঐতিহাসিক নয়-এগারোর মহা আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিশ্ব কম্পিত হামলার নেপথ্যে যে যৌক্তিক কারণ ও কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল তার গভীর বিশ্লেষণের জন্য প্রথমেই মনোযোগ এবং দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন আমেরিকার যুগপৎ অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহের দিকে। ক্লিনট তখন মসনদে। আমি বাল্টিমোরে, ঘুম থেকে উঠে একদিন এক অবিশ্বাস্য নাটকীয় সংবাদ জানতে পারি। হোয়াইট হাউজে ইসলামের চাঁদ তারা পতাকা উড়ছে। ভয়ের কিছু ছিল না, কারণ আলকায়েদার জন্ম তখনো হয়নি এবং বিন লাদেনেরও পাত্তা ছিল না যিনি হোয়াইট হাউজে এসে এ ধরনের অঘটন ঘটানোর হিম্মত রাখেন। তবে সে সময় এখানকার মিডিয়ায় একটি ঝড় বয়ে যাচ্ছিল : যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। এ সময়টিতে আমি বাল্টিমোর জন্স হপকিন্সে গবেষণা করছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাল্টিমোরের হোমউড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির বেসমেন্টের ওয়ালের একটি তথ্য আমার চোখে পড়ে : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক শত হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করছে। মিডিয়ার অন্য সূত্রে জানতে পারি, এই এক লাখ নও মুসলিমের মধ্যে মহিলার সংখ্যা বেশি। পাশ্চাত্য ভাবধারায় লালিত পালিত মুক্ত হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মেয়েরা এত ঝুঁকি নিয়ে কেন ইসলামকে পছন্দ করছে যেখানে বিদ্যমান শৃঙ্খলা, আত্মসমর্পণ ও ভিন্ন রূপ হওয়ার বিধান। আমেরিকার স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সময় জনসংখ্যার বেশির ভাগ ছিল খ্রিষ্টান। এর পর ছিল ইহুদি। অন্যান্য ধর্মের লোক আনুপাতিকভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। সরকারিভাবে তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, খ্রিষ্টান ও ইহুদি এই দুই ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়ানো হবে। কিনটনের সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি সংখ্যা যেখানে ছয় মিলিয়ন ছিল সে ক্ষেত্রে মুসলমানের সংখ্যা ছয় মিলিয়ন থেকে ধীরে ধীরে সাত মিলিয়নও ছাপিয়ে যায় বলে শোনা যায়। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে হোয়াইট হাউজে তিনটি ধর্মের পতাকা উড়বে। বড় প্রশ্ন হলো : এই হারে ধর্মান্তরিত হলে এর প্রভাব তো অচিরে হোয়াইট হাউজের নির্বাচনের ওপরও পড়তে বাধ্য। মুসলমানদের ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে বা এখানকার মুসলমান অধিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব লাভের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও মন্থর গতি অনায়াসে কার্যকর করা গেলেও ধর্মান্তরিত হওয়ার এই হার বন্ধ করার তো কোনো আইনগত উপায় খোলা নেই। বছরে এক লাখ মানুষের ধর্মান্তরের এই হার যে সময়ের সাথে সাথে আরো গতি পাবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে? ভয়ঙ্কর, দানবীয় এমন কোনো ঘটনা সংঘটিত করতে হবে যাতে আমেরিকানেরা সহজে বুঝতে পারবে মুসলমানেরা তাদের এক নম্বর শত্রু, জাতি হিসেবে তারা পৈশাচিক, দানবীয়, বর্বর, ভয়ঙ্কর। কাজেই আমেরিকানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করার উপায় এটিই। এর সাথে যুক্ত হবে মিডিয়ার ব্যাপক প্রচার। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। রেডিও, টিভি, পত্রপত্রিকা, মুভি, ধারাবাহিক নাটক, টকশো, প্রেক্ষাগৃহ সর্বত্রই শুরু করে দেয়া হয় মুসলিম ও আরববিরোধী প্রপাগান্ডার তুফান, যেটি হয়ে দাঁড়ায় টুইন টাওয়ারে ভয়ঙ্কর হামলার মতোই বীভৎস। সিগ ও ওয়্যাগ দ্য ডগ এ দু’টি মুভি থিয়েটারে আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল যা ছিল খুব বেশি মুসলিমবিরোধী। এমনকি পাবলিক টিভিতে এক ঘণ্টার ডকুমেন্টারি ফিল্মÑ জিহাদ ইন আমেরিকা শিরোনামে দেখানো হয়। মূল কথা, মিডিয়া সুকৌশলে একটি বার্তা আমেরিকানদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নেয় যে, মুসলমানেরা সন্ত্রাসী, মুসলমান হওয়া মানে সন্ত্রাসী হওয়া এবং এই লক্ষ্যে তারা জিহাদ করছে এই ভূখণ্ডে। এসব প্রপাগান্ডা থেকে এটা সহজেই উপলব্ধি করা যায় ইসলাম ফোবিয়া ইহুদি লবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে কত বেশি প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। ২০০১ সালে নয়-এগারোতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হামলা হলেও এই একই জায়গায় প্রায় আট বছর আগে ১৯৯৩-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুসলমানেরা সন্ত্রাসী এটা প্রমাণের সূচনার মাধ্যমে নীলনকশা প্রণীত হয়। বিশ্বনন্দিত সাময়িকী রিডার্স ডাইডেস্টে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে এই বিস্ফোরণের ওপর একটি নিবন্ধে বলা হয় : বোমা হামলার জন্য এ কেন্দ্রটি বেছে নেয়ার উদ্দেশ্য ছিলÑ এই টুইন টাওয়ারে বিশ্বের সব দেশের এবং সব জাতির লোক অবস্থান করে এবং তাদের সংখ্যা একটি শহরের লোকসংখ্যার কাছাকাছি হবে। অতএব এ কেন্দ্রে কিছু হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটি বিশ্বের সব জাতি ও দেশের এবং বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। এফবিআই পরিচালক ১৯৯৩ তে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার জন্য অভিযুক্ত করেন ওমর আবদেল রহমানের অনুসারী মুহাম্মাদ সালেহকে। পরে প্রমাণিত হয় ইসরাইলের মোসাদ অপারেটিভ এই হামলার নেপথ্য নায়ক (সূত্র : সঙ্কটাপন্ন সময়ে বিব্রতকর প্রশ্ন- জেমস এস অ্যাডাম)। সিএনএনের প্রথম রিপোর্টে স্বীকার করা হয়, যদি বোমা হামলাকারীরা বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ধ্বংস সাধনের পরিকল্পনা করত তাহলে বিস্ফোরক রাস্তার সমতলে বসাত, যার ফলে শত শত লোকের প্রাণহানি হতে পারত বা আহত হতো। বাল্টিমোর নিউট্রেন্ড পত্রিকা লেখে : বোমা হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল, যার ফলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হয়, সবচেয়ে কম লোক এর আওতায় পড়ে। অন্য দিকে আবার ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায় প্রবলভাবে সাড়া জাগানো খবরের গুরুত্ব। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আসলে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে প্রথমে হামলা ছিল একটি আগাম অভ্যন্তরীণ কৌশল, যার লক্ষ্য ছিল প্রচারমাধ্যমে স্পর্শকাতর অনুভূতি তৈরি করে মুসলমানদের সন্ত্রাসী ব্র্যান্ডে চিত্রিত ও পরিবেশিত করা এবং মুসলমানদের ব্যাপারে আমেরিকানদের সতর্ক ও উত্তেজিত করা। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হয় মিডিয়া প্রপাগান্ডা বা সন্ত্রাস। নীলনকশার শেষ বা চূড়ান্ত পর্যায়টি ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে আছড়ে পড়ল নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে দু’টি যাত্রীবাহী বিমান। অতঃপর আগুন, ধোঁয়া, তাসের ঘরের মতো দু’টি টাওয়ার ভেঙে পড়ল। এ ছবি গোটা বিশ্ব কতবার দেখেছে হিসাব নেই। যেমনটি দেখেছে পেন্টাগনের পশ্চিম অংশে আর একটি বিমান ভেঙে পড়ার স্থির চিত্র; তবে শুধু স্থির চিত্র। পেন্টাগনের ওপর বিমান ভেঙে পড়ার ভিডিও ফুটেজ বুশ প্রশাসন প্রকাশ করেনি। ‘ওপেন’ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যার সদস্যদের মধ্যে আছেন নোয়াম চমস্কি, পিট সিগার, আছেন সাংবাদিক, সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সফটওয়্যার, সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। সিএনএনের একটি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ‘ওপেন’ দাবি করেছেÑ বিমানের নাক টাওয়ারে স্পর্শের মুহূর্তেই বিশাল বিস্ফোরণ ঘটেছে ককপিটে। ওপেন-এর বক্তব্য বিমানের ককপিটে কী এমন থাকতে পারে যাতে সেখানে ওই রকম বিস্ফোরণ ঘটে। ট্রেড সেন্টারের দু’টি টাওয়ারের প্রতিটি বিমানের ধাক্কা খাবার ঠিক আগ মুহূর্তেই একই ধরনের আগুনের ঝলকানি দেখা গেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়া এরকম নিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়। বিমানে কি তা হলে ক্ষেপণাস্ত্র ছিল? যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ভেতর থেকে সংঘটিত ঘটনা। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষার পর সেখানে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। জোন্স বলেন, আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সরকারের এই তত্ত্বকে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি। কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে, নয়-এগারোর ঘটনা একটি ষড়যন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র যা বলছে তা সত্য নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন : পেন্টাগনে আসলে বিমান নয়, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কারণ বিমানের যাত্রীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কথিত বিমানের জ্যামিতিকভাবে গোলাকার মুখ সৃষ্টি কেবল কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যেই করা সম্ভব। বিশ্বের মানুষকে এ সম্পর্কে ধোঁকা দেয়া হয়েছে। যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা হতো। যাত্রীবাহী জেট বিমানের ব্লাক বক্স থেকে প্রাপ্ত ড্যাটার সাথে গণিত শাস্ত্রবিদ, ভূকম্পন বিশারদ ও ধ্বংসের ঘটনা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমতের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের দি বাল্টিমোর সান 'CIA Could be Behind 11 September Terrorist Attack' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কানাডার মন্ট্রিল থেকে প্রকাশিত দি গেজেট পত্রিকায় ডেভিড গোল্ডস্টেইন টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য খোদ প্রেসিডেন্ট বুশকে দায়ী করে বিন লাদেনকে এ অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে একাধিক বাস্তবসম্মত যুক্তি দিয়ে বলেছেন, এ কাজ কোনোভাবেই বিন লাদেনকে দিয়ে সম্ভব নয়। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্য বর্ণনায় বলেন, এ দু’টি দালান আশপাশে হেলে বা কাত হয়ে পড়ার বদলে ভেঙে নিচে দেবে গেছে। বিমানের আঘাতে ধসে পড়েছে বলে মনে হয়নি বরং মনে হয়েছে পরিকল্পিতভাবে ভবন দু’টি ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। তৃতীয় ভবনটি একইভাবে ধসে পড়েছে; কিন্তু এই ভবনে কোনো বিমান আঘাত হানেনি। আশপাশের ভবনগুলোর কোনো রকম ক্ষতি ছাড়া কিভাবে তৃতীয় ভবনটি ধসে পড়ল? পেন্টাগনে যে ভবনটি হামলা করেছিল তার ধ্বংসাবশেষের খোঁজ কেন পাওয়া গেল না বা আরোহীদের ছিন্ন ভিন্ন মৃতদেহ ও বিমানের ব্লাক বক্সের খোঁজ মিলল না কেন? ওপেন প্রশ্ন তুলেছেÑ গোটা বিশ্ব টিভিতে দেখেছে, গল গল করে ঘন সাদা ধোঁয়ার আস্তরণের মধ্যে ভেঙে পড়েছে ট্রেড সেন্টারের টাওয়ার; কিন্তু সাদা ধোঁয়া কেন? ওপেনের দুই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ কানাডার কারবেল ও ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজির ফ্রেডি সিম্প্যাকসান জানাচ্ছেন, বিস্ফোরকের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেড, কার্বন ও সালফারের মিশ্রণ ছিল। তা না হলে এই পরিমাণ ছাইবিহীন সাদা ধোঁয়ার জন্ম হতে পারে না। তা হলে কি দূর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণও ঘটানো হয়েছিল টাওয়ারে? ওপেন গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে পেন্টাগন বিস্ফোরণ নিয়েও। একটি অত্যাধুনিক নজরদারি ক্যামেরায় তোলা একটি ছবির প্রতিটি ফ্রেম এক সেকেন্ডের ৮০০ ভাগে ভাগ করে ওপেন দেখাচ্ছে নীল আকাশ আর তার পরেই পেন্টাগনের একটি বাহুতে বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ, ভয়াবহ আগুন; কিন্তু বিমানের কোনো চিহ্নই নেই। তা হলে বিমান ভেঙে পড়ল কোথা থেকে? নয়-এগারোর ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার দশক পূর্তির পরেও বিবিসি, রয়টার, এএফপি পরিবেশিত সংবাদ : ‘আসলে কী ঘটেছিল ২০০১-এর এই দিনে? সত্যিই কী আলকায়েদা সে দিন মার্কিন শৈর্যে আঘাত হেনেছিল নাকি সবই পাতানো। সে প্রশ্নটি রহস্যময় রয়ে গেছে আজো অনেকের কাছে।’ নাইন-ইলেভেনের কে মূল নায়কÑ বুশ না লাদেন? ২০০৫ সালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি স্বীকার করেন, লাদেন কোথায় সে সম্পর্কে তারা প্রাথমিক ধারণা রাখেন; কিন্তু তাকে কৌশলগত কারণে আটক করা হচ্ছে না। তার যুক্তি ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় লাদেন জড়িত এ অভিযোগের সপক্ষে তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। আর সে জন্যই তাকে শেষে গ্রেফতার না করে অ্যাবোটাবাদ সেনানিবাসে অভিযান চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ পথ বেছে নিয়েছে কারণ লাদেনের বিচার হলে নাইন-ইলেভেনের এমন কিছু তথ্য ফাঁস হয়ে যেত, যা আমেরিকানদের জন্য সুখবর হতো না। কিনটনের মেয়াদ শেষে জুনিয়র বুশ রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত হন। ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হন আলগোর যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রার্থী বেছে নেন কট্টর ইহুদি লিবারম্যানকে। পরিস্থিতির নাটকীয় মোড়ে জুনিয়র বুশ স্পষ্টত দেখতে পান সব ইহুদি ভোট ডেমোক্র্যাটদের পাল্লায় যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারই কোনো ইহুদি হোয়াইট হাউজের নির্বাচনে প্রার্থিতার মনোনয়ন পায়। নির্বাচনে ভরাডুবি থেকে বাঁচার তার একমাত্র উপায় অবশিষ্ট ছিল মুসলিম আমেরিকানদের ভোট। তিনিই একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যিনি সরাসরি ভোট ভিক্ষা করলেন আমেরিকান মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের অনুকূলে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা আইনে সংযোজন করা হয়েছিল সিক্রেট ইভিডেন্স আর কথিত এই ইভিডেন্সের ফাঁদে ফেলা হতো শুধু মুসলমানদের এবং তাদের বেছে বেছে জেলে ভর্তি করা হতো। বুশ আলগোরের সাথে টিভি বিতর্কে সরাসরি বললেন, তিনি জয়ী হলে সিক্রেট ইভিডেন্স আইন তুলে দেবেন। কারণ তিনি এটাকে পক্ষপাতমূলক মনে করেন। আলগোর জবাবে বলেন, তিনি এটাকে পক্ষপাতমূলক মনে করেন না। [সূত্র : লেখক তখন যুক্তরাষ্ট্রে, টিভি বিতর্ক দর্শক] অতীতে আমেরিকান মুসলিম ভোট অপরিকল্পিতভাবে দুই দলে পড়ত, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী তারা ভোট দিত; কিন্তু এবারই প্রথম মুসলমানদের ভোট এক পাল্লায় পড়ল। বুশ জয়ী হলেন, নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে ইনভেস্টরস বিজনেস ডেইলি এক নিবন্ধে লিখল : আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। বুশ ক্ষমতার মসনদে গিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে সিক্রেট ইভিডেন্স বহাল রাখেন আর হোয়াইট হাউজ নির্বাচনকে চিরতরে মুসলিম ভোট প্রভাব বলয়মুক্ত রাখার নীলনকশা হিসেবে নাইন-ইলেভেন নাটক মঞ্চস্থ করেন। মুসলিম উম্মাহর এবং আমেরিকান মুসলমানদের অবশ্য করণীয় হচ্ছে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ধারা সৃষ্টি করা।

লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

লেখাটি দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ১১/৯ তারিখে প্রকাশিত।

Sunday, October 2, 2016

প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা ও বিশ্বাসের গুরুত্ব


মুহাম্মাদ আলী রেজা
ঢাকা, রবিবার,০২ অক্টোবর ২০১৬


প্রসারণশীল মহাবিশ্ব
মহাবিশ্ব প্রসারমাণ- এ আবিষ্কারটি বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম বৌদ্ধিক বিপ্লবগুলোর অন্যতম। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা কি কখনো ভাবার সুযোগ পাই; ছায়াপথগুলো প্রতি সেকেন্ডে৭০ কিলোমিটারের  চেয়ে বেশি গতিতে দূরাপসরণ করছে?
প্রত্যাশিত হিসাবের চেয়েও দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে মহাবিশ্ব। নাসা ও ইউরোপিয়ান স্পেস অ্যাজেন্সির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ধারণার চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ দ্রুতগতিতে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটে চলেছে। ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে ঘটা বিগব্যাঙ থেকে পাওয়া বিকিরণ পরিমাপ করে যে হিসাব বের করা হয়েছিল, তার সাথে মিলছে না বর্তমানে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার। প্রসারণশীল মহাবিশ্বের এই অভিক্রিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনার উপমার মাধ্যমে সহজেই উপলব্ধি করা যাবে। রাস্তায় চলন্ত একটি গাড়ি যখন কাছে এগিয়ে আসে তখন এর ইঞ্জিনের শব্দের তীক্ষ্ণতা তীব্রতর হয় এবং গাড়িটি যখন কাছে এসে দূরে অপসারণ করে, তখন শব্দের তীক্ষ্ণতা নিম্নতর হয়ে থাকে। আলোকের তরঙ্গের আচরণও একই রকম। আলোকের স্পন্দাঙ্ক খুব বেশি- সেকেন্ডে চার থেকে সাত লাখ মিলিয়ন। এর রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্পন্দাঙ্ক। আমাদের দৃষ্টিতে যা বিভিন্ন বর্ণ হিসেবে প্রতিভাত হয় সেগুলো হলো- আলোকের বিভিন্ন স্পন্দাঙ্ক। সর্বনিম্ন স্পন্দাঙ্ক দেখা যায় বর্ণালীর লালের দিকে। তারকা যদি আমাদের দিকে আসে তাহলে প্রতি সেকেন্ডে আমরা যে স্পন্দাঙ্ক পাব তা বেড়ে যাবে, যেমনটি শব্দ শ্রোতার দিকে এগিয়ে আসার সময় ঘটে থাকে। অনুরূপভাবে তারকা যদি আমাদের কাছ থেকে দূরে অপসারমাণ হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের কাছে যে তরঙ্গগুলো পৌঁছাচ্ছে তার স্পন্দাঙ্ক হবে ক্ষুদ্রতর। তারকার আলোর স্পন্দাঙ্ক মেপে এর লাল বিচ্যুতি হলে স্পষ্টত বোঝা যাবে, তারকাগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরাপসরণ করছে।
সূরা আয জারিয়ার ৪৭ আয়াতে নভোমণ্ডল প্রসারিত হচ্ছে উল্লিখিত হয়েছে। ‘নভোমণ্ডল নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী’।
এডউইন হাবল ১৯২৯ সালে প্রকাশ করেন যে, মহাবিশ্ব স্থিতাবস্থায় নেই। যে ছায়াপথটি যত দূরে অবস্থিত তার দূরাপসারণের গতিও তত বেশি। দেখা যায়- এক মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ প্রতি সেকেন্ডে ২২ দশমিক ৪ কিলোমিটার বেগে এবং দুই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ প্রতি সেকেন্ডে ৪৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার বেগে দূরাপসরণ করছে। অবাক বিস্ময়ের সাথে ভাবার বিষয়, বাস্তবে প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব আমাদের থেকে কত দূরে বিস্তৃতি লাভ করছে!
আমরা ক’জন গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখেছি, প্রকৃত ঈমানের স্বাদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে সর্বশেষ বিজ্ঞানের নভোমণ্ডল ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে ন্যূনতম একটি ধারণা একেবারে না থাকলেই নয়? প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক- ঈমানের সত্যিকার স্বাদ পাওয়ার জন্য এসব তথ্য জেনে কী হবে? মুজাদ্দেদ ইমান গাজ্জালি রহ: সেই মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ। বর্তমানে মহাকাশ বিজ্ঞানের যে বিকাশ হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগে এই বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা কোন পর্যায়ে ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। সেই যুগে তার একটি উপমা এখানে তুলে ধরলে আমরা একেবারে চমকে উঠব!
তিনি তার সময়ের এবং পরে সব কালের ঈমানদারদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন একটি উপমার মাধ্যমে, আল্লাহ পাকের প্রতি ঈমান সুদৃঢ় করার অতি সহজ একটি পথ। এটি হচ্ছে- ঈমানদারদের দৌড় শুধু মসজিদ নয়, বরং মহাকাশ বা মহাবিশ্ব সম্পর্কে যে ব্যক্তির কোনো ধারণাই নেই, তার ঈমানের স্বাদ বা স্তর হচ্ছে একজন Impotent (নপুংসক)-এর মতো, যার কোনো অনুভূতিই নেই নর-নারীর দৈহিক সম্পর্কের আসল মজা সম্পর্কে। বাস্তব দুনিয়ায় সবচেয়ে মজাদার, অপার ফুর্তির কোনো কিছু থেকে থাকলে তা হচ্ছে একমাত্র এটি। তেমনি গাজ্জালি রহ:-এর মতে, প্রকৃত ঈমানের আসল স্বাদ বা তৃপ্তি পেতে প্রয়োজন এবং পাওয়ার সহজ পথ হচ্ছে আল্লাহ পাকের অপার রহস্য মহাবিশ্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া। ঈমানদারদের তাচ্ছিল্য করে প্রচলিত কথায় বলে- ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ’! কিন্তু আমরা ক’জন ওয়াকিবহাল, সে সময়ে সমরকন্দ, দামেস্ক, কায়রো আর করডোভায় প্রথম বড় বড় মানমন্দির গড়ে তুলে আরব মুসলমানেরা। মুসলিম জ্যোতিবেত্তারা এমন সব পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন, যে গুলো ১২ বছরের ওপরে দীর্ঘায়িত হয়েছিল। সে সময়ের মুসলিম বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান কোন অবস্থানে পৌঁছেছিল তার বর্ণনা একটি ঘটনায় ফুটে ওঠে।
সন্যাসী গারভাট (দ্বিতীয় সিলভেস্ট নামে তিনি ৯৯৯ সালে পোপ হন) যখন করডোভার মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে খ্রিষ্ট ধর্মাচরণে পুনরায় ফিরে এলেন তখন লোকে রটাল, তিনি নাকি সেখানে শয়তানের সাথে দহরম পর্যন্ত করে এসেছেন।
পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ স্থল। এ স্থলভাগে সাত শ’ কোটি মানুষ ছাড়াও রয়েছে কোটি কোটি জীবজন্তু, পশুপাখি, ক্ষেত-খামার, রাস্তাঘাট, পাহাড়-পর্বত, বিশাল বিশাল মরুদ্যান, বনজঙ্গল ও আরো কত কী। আর এত সবকিছু নিয়েই আমাদের আবাসভূমি পৃথিবী, যার বিশালত্ব কল্পনা করাও অনেক দুরূহ নয় কি? তাহলে রাতের আকাশের অগণিত তারকারাজি ও ছায়াপথ?
মহাকাশ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কিত বিজ্ঞানের সর্বশেষ খবরাখবর
আমাদের সূর্য একটি অতি সাধারণ তারকা। এর আকার তারকাগুলোর গড় আকারের মতোই।
আমাদের বাসভূমির তারকা সূর্যের ব্যাস ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন কিলোমিটার। এর অর্থ হলো ১০৯টি পৃথিবী সূর্যের পৃষ্ঠে সাজিয়ে রাখা যায়। এটি এত বড় যে, ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন পৃথিবী এর মধ্যে ভরে রাখা যায়। আমাদের সৌরগ্রহগুলো সূর্যের চতুর্দিকে চাকতির মতো জায়গা জুড়ে আছে, যার দূরত্ব সূর্য থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন কিলোমিটার। একটি তারকার বর্ণনা যদি এমন হয়, সে ক্ষেত্রে মহাবিশ্বে তারকার সংখ্যা কত? বাস্তবে বিশাল সংখ্যার তারকা নিয়ে একটি ছায়াপথ। তাহলে মহাবিশ্বে তারকা ও ছায়াপথ আসলে কয়টি?
Kornreich মহাবিশ্বে ১০ ট্রিলিয়ন ছায়াপথ ধরে একটি রাফ হিসাব বের করেছেন- ছায়াপথের ১০০ বিলিয়ন তারকার সাথে এই সংখ্যা গুণ করলে হয় ১০০ অকটিলিয়ন (octillion) তারকা। তার মানে ১ এর সাথে ২৯টা শূন্য। Kornreich জোর দিয়ে বলেন, এটা সাধারণ হিসাব, তবে গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মহাবিশ্বে ছায়াপথের সংখ্যা আরো বেশি।
দেখা যায়, ছায়াপথের সংখ্যা হবে ১০০ থেকে ১২৫ বিলিয়ন। আবার সবচেয়ে বড় তারকাগুলো সূর্যের চেয়ে পাঁচ শ’ গুণ শুধু বড় নয়, সেই সাথে এক লাখ গুণ বেশি উজ্জ্বল। ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত যে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল তার ভর তিন মিলিয়ন সূর্যের সমান হয়ে থাকে। আপনি যদি প্রতি সেকেন্ডে একটি করে তারকা গণনা করেন, সে ক্ষেত্রে এই হারে সব তারকা গুনতে পাঁচ হাজার বছর লাগবে। ছায়াপথগুলো মহাকাশে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না থেকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে একে অপর থেকে বহু দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করে। সব ছায়াপথ এক করলে তারা মহাশূন্যের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ স্থান দখল করবে, যার অর্থ দাঁড়ায় বাস্তবে মহাশূন্য এত বিশাল যে, বিজ্ঞানের সুপার কল্পকাহিনী পর্যন্ত এর কাছে হার মানবে।
ছায়াপথ কত বড়?
এত বড় যে, বড় ধরনের ছায়াপথের আড়াআড়ি দূরত্ব এক মিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি হবে [এক বছরে প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার মাইল বেগে যে দূরত্ব অতিক্রম করা যায়, সেটি হলো- এক আলোকবর্ষ (৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।)]
আমরা এমন একটি ছায়াপথে থাকি, যেটা আড়াআড়ি মাপে প্রায় এক লাখ আলোকবর্ষ। আমাদের ছায়াপথটি ধীর গতিতে ঘূর্ণায়মান। এর সর্পিল বাহুগুলোতে অবস্থিত তারকাগুলো প্রায় কয়েক শ’ মিলিয়ন বছরে একবার করে কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে।
সবচেয়ে ছোট ছায়াপথের নাম ডর্ফ, যার প্রশস্ত কয়েক হাজার আলোকবর্ষের দূরত্বের। অ্যান্ড্রোমেডার ছায়াপথটির এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব হবে দুই লাখ ৫০ হাজার আলোকবর্ষ। মজার বিষয় হচ্ছে, এই মুহূর্তে মহাবিশ্বের দিকে তাকালে দূর অতীতের মহাবিশ্বকে আমরা আসলে কিন্তু দেখতে পাবো, কেননা এই সময়ে দূর তারকা ছায়াপথ থেকে আলো এসে কেবল আমাদের কাছে পৌঁছেছে। যে কোয়সারগুলো এখন আমরা দেখছি, সেই আলো আমাদের কাছে পৌঁছতে শত শত কোটি বছর লেগে গেছে। আমাদের নিকটতম তারকা Proxima Centauri থেকে আলো আসতে লাগবে ৪ দশমিক ৩ বর্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি সর্বাধিক বিক্রীত ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের বই ‘অ্যা হিস্ট্রি অব গড’ পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে, ‘কুরআন পাকে সব সময়ই বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে আল্লাহ পাকের নিদর্শন বা বাণীর (আয়াত) রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য। আর এ কারণে ইসলামের অনুসারীরা যুক্তি ও কারণকে এড়িয়ে না গিয়ে গভীর মনোযোগ এবং বিশেষ কৌতূহলের সাথে পৃথিবীর সব কিছুকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পরে দেখা যায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে (ন্যাচারাল সায়েন্স) মুসলমানদের এক উৎকৃষ্ট ঐতিহ্য গড়ে তোলার, যা কখনো বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের বিরোধ বা সংঘর্ষ ঘটায়নি, খ্রিষ্টান ধর্মের ক্ষেত্রে যেটা দেখা গেছে। কাজেই মহাবিশ্বের সব কিছুকে পর্যবেক্ষণ ও রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমেই কেবল আল্লাহকে খুঁজে পাওয়া ও তার নৈকট্য লাভ করা যেতে পারে। ঈমান বাড়ানোর পথ বা উপায় হলো সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। হাদিস শরিফে আছে- সৃষ্টিরহস্য নিয়ে কিছু সময় চিন্তাভাবনা করা, সারা রাত নফল এবাদত থেকেও উত্তম।
মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই এর পেছনে রয়েছে এক অকল্পনীয় মহাজ্ঞানী সত্তার এক রহস্যময় অভিপ্রেত। বিজ্ঞানীর দুরভিসারি জিজ্ঞাসা সেখানে বিমূঢ় হয়ে যায়- বিজ্ঞানের সমাগত চূড়ান্ত অগ্রগতিও সেখান থেকে স্তব্ধ হয়ে ফিরে আসবে; কিন্তু সেই অনন্ত মহাজাগতিক রহস্যের প্রতিভাস বিজ্ঞানীর মনকে এই নিশ্চিত প্রত্যয়ে উদ্বেল করে তোলে, এই মহাবিশ্বের একজন নিয়ন্ত্রা রয়েছেন। তিনি অলৌকিক জ্ঞানময়, তাঁর সৃষ্টিকে অনুভব করা যায় কিন্তু তাকে কল্পনা করা যায় না।’ 
লেখক : সাবেক শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

- See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/157638#sthash.OEPzWtRT.dpuf