Thursday, July 14, 2016

যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হলো

নয়া দিগন্ত
১৪ জুলাই ২০১৬,বৃহস্পতিবার,
যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হলো
মুহাম্মদ আলী রেজা
জন্মলগ্ন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতি ইহুদি লবি প্রভাবিত এবং বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত। বুশ যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেন, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের এক অঘটন ঘটে যায়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আলগোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কট্টর ইহুদি লিবারম্যানকে মনোনীত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন অখ্রিষ্টান প্রার্থী হন। নিশ্চিতভাবে আমেরিকান ইহুদিদের সব ভোট আলগোরের পাল্লায় যাচ্ছে। আর এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি মাত্র পথ অবশিষ্ট ছিল : ইহুদিদের ভোটের বিপরীতে সব আমেরিকান মুসলিমদের ভোট। আর ঠিক এই সময়ে হোয়াইট হাউজে চাঁদ-তারা পতাকা ওঠানো হয়েছে। স্বাধীনতার পর হোয়াইট হাউজে খ্রিষ্টান ও ইহুদি এ দুই ধর্মের পতাকা উড়ত। কারণ তারা সংখ্যায় অনেক ছিল। দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে ইহুদিদের সংখ্যা টপকে যায় মুসলমানেরা। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয় এখন থেকে তিন ধর্মের পতাকা উড়বে হোয়াইট হাউজে। আবার সে সময় এখানকার মিডিয়ায় একটি ঝড় বয়ে যাচ্ছিল : যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। জন হপকিন্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয়। বাল্টিমোরে এর দু’টি ক্যাম্পাস। আমি হোম উড ক্যাম্পাসে গবেষণা করছি। এখানে লাইব্রেরির বেসমেন্টের দেয়ালে একটি নিউজ আমার দৃষ্টিতে আসে। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করছেন। বাইরে এসে পরে জানতে পারি, পুরুষদের চেয়ে মহিলারা বেশি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন। 'Daughters of Another Path' by Carol Anway 1996 বইটি হাতে পাই। দেখতে পাই এ বইটিতে ফুটে উঠেছে আমেরিকান রমণীদের ইসলাম গ্রহণের কথামালা। বইটি এত জনপ্রিয় যে, সাথে সাথে ফ্রেঞ্চ ভাষায় ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত হয়। ইন্টারনেটে একটি মেয়ে লিখেছেন ‘বইটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি। এ তো আমারই কথা। প্রথমে আব্বা-আম্মাকে পড়তে দিয়ে বলি, এ বইতে পাবে কেন আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছি।’ বইটি আমার এত ভালো লেগেছিল যে, ঠিক করলাম অনুবাদ করব। এসে দেখি ২০০০ সালেই বইটি বাংলায় ঢাকা থেকে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইট। বইটিতে আছে আমেরিকান মেয়েরা কেন তাদের এত দিনকার খ্রিষ্টীয় পরিবেশ ছেড়ে পছন্দ করছে ইসলামকে। যে ধর্মে আছে শৃঙ্খলা, আত্মসমর্পণ ও ভিন্নরূপ হওয়ার বিধান।
আমেরিকায় দ্রুত বেড়ে চলা ধর্ম হওয়ায় মুসলমানদের সমাজে বিব্রত অবস্থায় ফেলতে বা কোণঠাসা করার মানসে তখন আইনে প্রয়োগ করা হয় Secret evidence। এই গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে মুসলমানদের জেলে ঢোকানো হতো। আর এই Secret evidence--এর প্রয়োগ শুধু মুসলমানদের বেলায় দেখা যেত। এখানকার সব আমেরিকান মুসলিমদের একমাত্র দাবি ছিল এটির অবসান। বুশের নির্বাচনে জেতার জন্য দরকার ছিল মুসলিম ভোট। তিনি এ সুযোগটি কাজে লাগান। আলগোরের সাথে জাতীয় নির্বাচনী বিতর্কে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সিক্রেট এভিডেন্সকে তিনি ডিসক্রিমিনেটরি ( বৈষম্যমূলক) মনে করেন। আলগোর জবাবে বললেন, তিনি তা মনে করেন না। বাস্তবে ঐতিহাসিকভাবে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জাতীয় নির্বাচনী বিতর্কে এই প্রথম মুসলমানদের দিকে কথা বললেন। তার বিনিময়ে আমেরিকান মুসলমানেরা এক জোট হয়ে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে বুশের প ল্লায় ভট দেন। দরজায় কড়া নেড়ে শেষে ইহুদি লবির বিপরীতে বুশকে বিজয়ী করেন। আগে মুসলমানেরা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে ভোট দিতেন; জোটবদ্ধভাবে এক পাল্লায় এবারই প্রথম। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ইনভেস্টরস ডেইলি এক নিবন্ধে মন্তব্য করে : আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা বিজয়ের চেয়ে বেশি ছিল।
মুসলিম আমেরিকান ভোটে বিজয়ী বুশ উপলব্ধি করলেন এভাবে চললে একদিন মুসলমানেরা ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটব্যাংকই মূল । দ্রুত বেড়ে ওঠা ধর্ম ইসলামকে ঠেকাতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।
ডেভিড গোল্ডস্টেইন কানাডার মন্ট্রিল থেকে প্রকাশিত ‘দ্য গেজেট’ পত্রিকায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য খোদ বুশকে দায়ী করে বিন লাদেনকে বেকসুর খালাস দিয়ে বাস্তবসম্মত যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন : এ কাজ বিন লাদেনকে দিয়ে সম্ভব নয়। বুশের অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি ইসলামকে নির্মূল করা। আর সে কারণে তার প্রথম ভাষণে ক্রুসডের ডাক দিয়েছিলেন।
হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা চার্লিশি বলেছিলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন ভবনে ৯/১১-র তাণ্ডব চালিয়েছে। ২০ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য এক চলচ্চিত্রে এই হামলার অষ্টম বার্ষিকীর প্রাক্কালে এ দাবি করেন। নিরপে তদন্তের জন্য ও সোচ্চার হওয়ার জন্য মার্কিন জনগণের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে ৯/১১-এর ঘটনা ছিল একটি ষড়যন্ত্র। বিশ্বের মানুষকে এ ঘটনা দিয়ে ধোঁকা দেয়া হয়েছে। বিমানের যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীার মাধ্যমে তাদের অবশ্যই শনাক্ত করা হতো।
জাতিসঙ্ঘের ৬৫তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ বলেন- ৯/১১ একটি মিথ্যা ঘটনা। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম অজুহাত। এ হামলা ছিল গোয়েন্দা সংস্থার জটিল দৃশ্যকল্প ও কর্মকাণ্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জেন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ: নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ভেতর থেকেই সংঘটিত। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সরকারের এ তত্ত্বকে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি। টুইন টাওয়ারের ধ্বংস্তূপ পরীায় নিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের।
২৮-৯-২০০১ করাচির দৈনিক উম্মতের সাথে এক সাাৎকারে ওসামা বিন লাদেন বলেছিলেনÑ ইতঃপূর্বে বলেছি, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত ৯/১১ হামলায় জড়িত নই। মুসলিম হিসেবে যথাসম্ভব মিথ্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এ হামলাগুলো সম্পর্কে কোনো কিছুই জানতাম না। তা ছাড়া নিরীহ মহিলা, শিশু ও অন্যান্য মানুষের হত্যাকাণ্ডকে প্রশংসনীয় বিষয় বলে মনে করি না। নিরীহ মহিলা, শিশু ও অন্য লোকজনকে তি করা থেকে বিরত থাকার জন্য ইসলামের কঠোর নির্দেশ রয়েছে। যুদ্ধের েেত্রও এই নীতি প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রই মহিলা, শিশু ও সাধারণ মানুষের সাথে সব ধরনের দুর্ব্যবহার করে থাকে। অনেকেই মনে করেন, বিন লাদেনকে আটক না করে হত্যা করা হয়েছে শুধু এ জন্য যে, তার বিচার হলে অনেক তথ্য বা রহস্য ফাঁস হয়ে যেত, যা কখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুখকর হওয়ার নয়। অনেকের অভিমত, বুশের নির্বাচনী আশ্বাস পেয়ে মুসলিম আমেরিকানরা একজোটে ভোট দিয়ে বুশকে মতায় আনে বিধায় তারা আর কখনো যাতে আমেরিকার মাটিতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করতে না পারে, তা চিরস্থায়ীভাবে নিশ্চিত করার জন্য ঘটানো হয় ৯/১১-এর নারকীয় তাণ্ডব।
যুক্তরাষ্ট্রে এবার নতুন কৈশলে ৯/১১। যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়াতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে! মুসলমানদের প্রতি ভীতি ও ঘৃণা ছড়াতে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে। এমনই একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে কাউন্সিল অব আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন (সিএআইআর) ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায়।
গত ২০ জুন ২০১৬ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৭৪টি গ্রুপ এতে নিজেদের জড়িয়েছে। এদের মধ্যে আছে : নারীবাদী, খ্রিষ্টান, ইহুদি গ্রুপ, এমনকি প্রতিষ্ঠিত সংবাদ সংস্থাও। তারা কেউ দিয়েছে অর্থের জোগান, কেউ চালিয়েছে প্রপাগান্ডা।
সিএআইআরের মুখপাত্র উইলফ্রেডো আমর রুইজ আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, ‘এই কর্মকাণ্ডটি এখন একটি শিল্পের রূপ নিয়েছে। ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়ানোর এ কাজ থেকে লাখ লাখ টাকা উপার্জন হচ্ছে। তারা কখনো কখনো নিজেদের ইসলামিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করছে।’
‘তারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করছে যেন, মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। তারা আমেরিকানদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, মুসলমানরা আমেরিকান কমিউনিটির অংশ নয়। তারা আমেরিকার বিশ্বস্ত নাগরিকও নয়।’
রউজ বলছিলেন, এর দু’টি বিপজ্জনক দিক : একটি ঘৃণা থেকে অপরাধ বৃদ্ধি করছে এবং অন্যটি মুসলমানদের বিপে আইন প্রয়োগ হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেছেন, গত এক বছরে শুধু ফোরিডাতেই মুসলিমবিরোধী অপরাধ বেড়েছে প্রায় ৫০০ গুণ। গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে মসজিদ। একাধিক ইসলামিক গ্রুপকে বোমা হামলার হুমকি দেয়া হয়েছে।‘ফোরিডার সরকারও স্কুলের পাঠ্যবই থেকে ইসলামের বিষয়াদি প্রত্যাহার করছেন।’ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর থেকে মুসলিম ধর্মচর্চার নিন্দা জানিয়ে রাজ্যসভায় উত্থাপিত বিল বা সংশোধনীর সংখ্যা বেড়েছে। ফোরিডার একজন এমপি অ্যালান হায়েসের অভিযোগ, ‘আমাদের ধর্ম, রাজনীতি ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন ইসলাম এবং শরিয়াহ আইনের আক্রমণের মুখে। তারা আমাদের দেশকে পরাস্ত করতে চায়।’
মার্কিন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোস্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (আইএসপিইউ) পরিচালক মেইরা নেগাজ বলছিলেন, গত মার্চে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, আমেরিকার প্রতি পাঁচজনের একজন মুসলমানের নিয়মিত বৈষম্যের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যাদের অর্ধেক বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন।
জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার।
মেইরা বলছিলেন, এ বৈষম্যের জন্য যতটা না সন্ত্রাসী ঘটনা দায়ী, তার চেয়ে বেশি যোগসূত্র রয়েছে রাজনীতির সাথে। নেগাজ জোর দিয়ে বলেন, এই ইসলাম-বিদ্বেষ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি এবং এর প্রভাব পড়বে দেশটির সব জনগোষ্ঠীর ওপর। হ
লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

Monday, June 20, 2016

বুশের ক্ষত ওবামা ঢাকবেন কিভাবে!

বুশের ক্ষত ওবামা ঢাকবেন কিভাবে!

দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ এবং বিশ্ব মোড়ল হওয়ার পরেও বিশ্ব মানচিত্রে আমেরিকা বলে কোনো দেশেরই অস্তিত্ব নেই। তা হলে আমেকিরান কারা? এই জটিলতা বা অস্পষ্টতার কারণে অনেকে মার্কিনি বলে ডেকে থাকে। বাস্তবে সারা দুনিয়ার লোকেরা যাদের এই মুহূর্তে আমেরিকান বলে জানেন, তারা আর কেউ নন, কেবল উত্তর আমেরিকার একটি দেশ আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের (ইউনাইটেড স্টেট অব আমেরিকা) নাগরিক। আসলে কিন্তু উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা এই দুই মহাদেশের সব দেশের লোকই আমেরিকান হওয়ার দাবিদার। যেমনটি আফ্রিকান, এশিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান অর্থাৎ অন্য সবার জন্য প্রযোজ্য। সে ক্ষেত্রে ইউএসএ’র নাগরিকেরা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কেবল নিজেদের আমেরিকান হিসেবে পরিচয় দেয়ার একচেটিয়া অধিকার হাতিয়ে বা ছিনিয়ে নিয়েছে। আবার মজার বিষয় হলো, এভাবে আমেরিকান হওয়ার মনোপলি বাগিয়ে নেয়ার পরও খোদ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে কিন্তু অফিসিয়ালি কোনো আমেরিকানই খুঁজে পাওয়া যাবে না। হাস্যকর বটে? এ আবার কেমন কথা? এ দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি জনস হপকিন্সের এক ছাত্র স্টুডেন্ট ম্যাগাজিনে এক নিবন্ধে লিখেছেন : জন্মগতভাবে আমেরিকান হয়েও অফিসিয়ালি বলতে বা লিখতে পারি না সরাসরি যে, আমি আমেরিকান। কেননা এই সাথে আবার বলতে হয় কিভাবে বা কোন পরিচয়ে আমেরিকান? চায়নিজ, জাপানিজ, স্প্যানিশ, ব্রিটিশ, আফ্রিকান, ইতালীয়, অস্ট্রেলিয়ান ইত্যাদি হরেক রকমের আমেরিকান গিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের গোটা আমেরিকান জাতি। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ বা জাতি নেই, যারা আজকের আমেরিকার নাগরিক নয়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকানই হয়ে দাঁড়িয়েছে একমাত্র জাতি যেটি দুনিয়ার সব দেশ ও জাতির এক জগাখিচুড়ি সংমিশ্রণের ফসল। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের ভাষায়, জাতি হিসেবে আমরা অভিবাসীর জাতি। আবার মজার ব্যাপার হলো, আদিবাসীরা নিজ দেশে থেকেও সরাসরি বলতে পারে না আমেরিকান। ইন্ডিয়ান হিসেবে তাদের পরিচয় দিতে হয়। যদিও ঐতিহাসিভাবে তাদের কেউই এ দেশে ভারত থেকে আসেনি এবং তাদের পূর্বপুরুষের কেউই এমনকি ইন্ডিয়া দেখেনি বা না কোনো ইন্ডিয়ান ভাষা জানত! তার পরেও আজ অবধি তারা এ দেশে ইন্ডিয়ান হিসেবেই বেঁচে বা টিকে আছে। কলম্বাসের এক ঐতিহাসিক ভুলের জন্য আমেরিকার আদিবাসীরা ইন্ডিয়ান খেতাবটি পেয়েছিল। কলম্বাসের সময়ে ইউরোপ জানত না পৃথিবীর মানচিত্রে আমেরিকা বলে কোনো জায়গা আছে। ইতালীয় নাবিক কলম্বাস ভারতে আগমনের সমুদ্র রুট আবিষ্কারের জন্য নৌযাত্রা করেন। ভুলক্রমে তিনি এক নতুন জনপদে পৌঁছে যান, যেটি পরে জানা যায় উত্তর আমেরিকা। ভারতে পৌঁছে গেছি ধারণা থেকে পরে এই দেশের সবাইকে তিনি ইন্ডিয়ান বলে ডাকেন আর সেই থেকে আজো তারা ইন্ডিয়ান বা আমেরিকান।

যদিও ঐতিহাসিকভাবে এ কথা প্রচারিত যে, কলম্বাস আমেরিকার আবিষ্কারক কিন্তু মার্কিন মুল্লুকের বিভিন্ন জনপদে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ ও গবেষণায় এমন কিছু ঐতিহাসিক তথ্য ও উপাদান বেরিয়ে এসেছে, যার ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক এবং ঐতিহাসিকেরা ইতোমধ্যে দাবি করেছেন, ইতালীয় নাবিক কলম্বাস আমেরিকার প্রকৃত আবিষ্কারক নন। কলম্বাসের বহু আগে প্রায় ৫০০ বছর আগেই আফ্রিকান ও স্প্যানিশ আরব মুসলমানেরা আমেরিকার মাটিতে পৌঁছে যান। শিলালিপি, আরবীয় মুদ্রা ও অস্ত্রপাতির সন্ধান পেয়ে গবেষকেরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছেন। ওয়াশিংটন ডিসির এক কনফারেন্সে এর কিছু নমুনা ও তথ্য দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল।

আমেরিকার সর্বত্রই নিট অ্যান্ড কিন। তার পরও এ দেশে কোনো ডাস্টবিন নেই। অবাক হলাম জেনে যে, ডাস্টবিন কী তা-ও অনেকে জানে না। ব্রিটিশ শব্দ ডাস্টবিন এটাকে এরা বলে ট্রাশ ক্যান। টয়লেট/ল্যাট্রিনও নেই এ দেশে। তা হলে উপায়? এটা কি পরীর দেশ? শৌচাগারের সামনে লেখা রেস্টরুম সাথে পুরুষ/মহিলার ছবি। এ দেশে কোনো গ্রাউন্ড ফোর নেই। ব্রিটিশদের কাছে ফার্স্ট ফোর হচ্ছে দোতলা, ফোর্থ ফোর পাঁচতলা আর এখানে একতলা একতলাই এবং দশতলা দশতলাই। লিফটে পাঁচ নম্বর বোতাম টিপলে ছয়তলা নয় পাঁচতলায় পৌঁছে যাবেন। আমরা হিসাব এবং কাজের সুবিধার্থে ইঞ্চি, গজ, ফুট, মাইল ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছি কিন্তু আমেরিকানরা পুরনোটাই আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ওজন মাপের জন্য গ্রাম, কিলোগ্রাম বদলে পাউন্ড, তাপমাত্রা মাপতে সেলসিয়াসের বদলে ফারেন হাইট ডিগ্রি ব্যবহৃত হয়। রাস্তার ডান দিকে ড্রাইভ করে আর বাতি নেভাতে সুইচে নিচের দিকে আর জ্বালাতে ওপরের দিকে চাপ দেয়া হয়। এসব খুঁটিনাটি বিষয় হলেও হঠাৎ করে অবাক হতে হয় অন্য একটি ব্যাপারে। রিলেটিভিটি সাইন্স বলছে, কেবল আলোর চেয়ে গতিবেগ বেশি হলে সময় বা কারো বয়স ওঠানামা করতে পারে। কিন্তু অন্য দেশ থেকে এখানে এসেই বয়স এক বছর পর্যন্ত কমে বা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এটা হয় ভুলক্রমে। আমরা তারিখ লিখতে প্রথমে দিন পরে মাস উল্লেখ করি। ১২/১ বলতে আমাদের কাছে জানুয়ারির ১২ তারিখ আর ওখানে ১ ডিসেম্বর।

আপনি কেমন আছেন জিজ্ঞাসায় এখানে বলবে, What’s up? অথবা How you doing? বেশ কিছু আমেরিকানের ইংরেজি শব্দ তাদের নিজস্ব! আমি তামাশা করছি বলতে বলবে I am Kidding। যদিও Kidding এর বদলে ব্রিটিশ শব্দ Joking। আমেরিকানরা এ যাবৎ হাত দিয়ে ফুটবল খেলেছে। আর পা দিয়ে ফুটবল খেলার নাম দিয়েছে সকার। কেন এ দেশের লোকেরা পা দিয়ে না খেলে হাত দিয়ে ফুটবল খেলে? তার ইতিহাস লিখেছে স্থানীয় ম্যাগাজিন। অতীতে পৃথিবীর অন্য সব দেশের মতোই আমেরিকানরা পা দিয়েই ফুটবল খেলত। দেশের শীর্ষস্থানীয় দু’দলের মধ্যে উত্তেজনাকর খেলা। সেরা দু’দলের মধ্যে এক দলের দলনেতা ছিলেন সে সময়কার শীর্ষ ফুটবল ব্যক্তিত্ব। খেলা চলছে তো চলছেই। কেউই গোল করতে পারছে না। এক দলনেতা যিনি সে সময় সেরা ফুটবলার, আকস্মিক বল হাতে নিয়ে দৌড় দিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে চ্যালেঞ্জ করলেন : তোমাদের হারাতে আমাদের পায়ের দরকার নেই হাত দিয়েই হারিয়ে দেবো। এভাবে পায়ের বদলে হাত দিয়ে ফুটবল শুরু হলো আর আদি ফুটবল খেলা হলো সকার। বাল্টিমোর শহরে গাড়ি ড্রাইভ করছেন, এক স্থানে চোখে পড়বে, রাস্তার পাশে উঁচু করে দেয়াল গেঁথে বড় করে লেখা : আপনার সন্তানকে শিখান- সতীত্ব নোংরা শব্দ নয়। আমাদের মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, ভার্জিনিটি নোংরা শব্দ, এ কোন ধরনের কথা হলো? যে মেয়ের ছেলে বন্ধু নেই তার খেতাব ভার্জিন। মেয়েটির কোনো গুণ, যোগ্যতা এবং আকর্ষণ নেই বলেই সে বয়ফ্রেন্ড পায়নি। এ ধরনের মনোভাব থেকে জন্ম হয়েছে ‘ভার্জিনিটি নোংরা শব্দ’। সে জন্য অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে দেয়াল লিখনের মাধ্যমে। আমাদের সমাজে সতী শব্দটি কোনোকালেই খারাপ অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, আর এটা কখনো ভাবাও যায় না। এই সমাজে নোংরামি কোনপর্যায়ে উন্নীত হলে সতীত্বকে নোংরা শব্দ মনে করার আবহাওয়া সৃষ্টি হতে পারে? বেসবল খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম। খেলা দেখছি। ক’টি মেয়েকে ক্যান্ডি উপহার দিতে দেখলাম। একটি হাতে পেয়ে খুলে দেখি গায়ে একটি কাগজে লেখা PURE LOVE এবং ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা। বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, ডেটিং, লিভ টুগেদার- হরেক রকম ব্যাপারস্যাপার। সব পথ ঘুরেফিরে এখন সামাজিক আন্দোলন PURE LOVE পেতে। জাতীয় টিভির এক অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি দাবি করছে, সে ১০০ জনের সাথে ডেটিং করেছে। গুনে গুনে ১০০ পূরণ করে বলছে শুনে পরিচালকের প্রশ্ন : কেন? জবাব হলো, মহিলার সংখ্যা এত বেশি কুকুরের মতো। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এটি সমাজের একটি প্রতিচ্ছবিও বটে।

সব রাজ্যেই দেখা যাচ্ছে পাত্রীরা তাদের চেয়ে কম শিক্ষিত পাত্রদের জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, মেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। নারী বিশেষজ্ঞদের অভিমত : নিজেদের স্বার্থেই মেয়েদের এই সুবিধা গ্রহণ করা উচিত নয়। তার পরও এখন পর্যন্ত নির্বাচনে কোনো মহিলা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সৌভাগ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্য দিকে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলনেত্রী, প্রধান বিরোধী দলনেত্রী, সংসদের স্পিকার নারী। যেন নারী নেতৃত্বের স্বর্গভূমিতে অবগাহন করি আমরা।

ক্লিনটন ক্ষমতায়। হোয়াইট হাউজে ইসলামের চাঁদ তারা পতাকা উড়ছে। লাদেন-আলকায়েদা তখনো আত্মপ্রকাশ করেনি। কে ঘটাল এটা? মিডিয়ায় হই চই পড়ে গেল। পরের দিন পতাকা উধাও হয়ে যায় এবং মিডিয়ায় এটা প্রকাশিত হলে তার পর থেকেই এটা আকাশে শোভা পাচ্ছে। অবাক কাণ্ড : হোয়াইট হাউজ জানে না কারা পতাকা চুরি করেছিল এবং পরে কে বা কারা এটা যথাস্থানে উড়িয়েছে? স্বাধীনতার পর থেকে হোয়াইট হাউজের আকাশে খ্রিষ্টান এবং ইহুদি এই দু’ধর্মের পতাকা উড়ত। কারণ হিসেবে তখন এই দু’ধর্মের লোক ছিল অধিক সংখ্যায়। অন্য কোনো ধর্মের লোক এদের ধারেকাছে ছিল না। দেখতে দেখতে এক এক করে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে ইহুদিদের সমান হয়ে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে। তখন সিদ্ধান্ত হয় এখন থেকে তিন ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়বে। ওই সময় মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত একটি খবর ছিল আমেরিকায় দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম ইসলাম। জনস হপকিনস আমেরিকার সেরা মেডিক্যাল রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয়। এর বাল্টিমোরের হোমউড় ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির বেসমেন্টের দেয়ালে আটকানো একটি তথ্য আমার চোখে পড়ে। লেখা ছিল : প্রতি বছর আমেরিকায় এক শত হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। পরে মিডিয়ায় আবার দেখতে পাই পুরুষের চেয়ে মহিলারা ইসলাম গ্রহণে এগিয়ে। মুভি, নাটক, সিরিয়াল সর্বত্র একই কথা ও প্রপাগান্ডা- মুসলিম পরিবার, সমাজ ও দেশে নারীরা দাসীর মতো জীবন কাটায়। এত হই চই ও প্রচারের পরেও নারীরা নারী স্বাধীনতার দেশে কেন এই ধর্মে আসছে? সেই মুহূর্তে আমেরিকান ইতিহাসে এক চাঞ্চল্যকর নাটকীয় ঘটনা ঘটে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন- আলগোরের সাথে জুনিয়র বুশের। বুশ নিশ্চিত হলেন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী আলগোর ইহুদি ভোট পাচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে খ্রিষ্টান ভোট প্রায় সমান্তরালভাবে দু’দলের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ইহুদি লবি এত বেশি সক্রিয় এবং সুসংগঠিত যে, তারা যে দিকে সমর্থন দেয় সেই পক্ষই জয়ী হয়। আর মুসলিম ভোট অপরিকল্পিত হওয়ায় প্রত্যেকে নিজস্ব পছন্দে ভোট দিত। ফলে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই ভোটের প্রভাব ছিল একেবারে শূন্য। আর সে জন্য মুসলিম ভোট কোনোকালে ফ্যাক্টর হিসেবে কখনো বিবেচিত হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বুশ লক্ষ করলেন, সব মুসলিম ভোট যদি তার পাল্লায় আসে কেবল তখনই তিনি ইহুদি লবির সমর্থন ব্যতিরেকে জিততে পারেন। বুশ মুসলিম ভোট পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এই সময়ে মুসলিম সমাজের একমাত্র প্রাণের দাবি ছিল : জননিরাপত্তা আইনে সেক্রেট অ্যাজেন্ডা রহিত করা, কেননা এই আইনের ফাঁকফোকরে ফেলে শুধু মুসলমান আমেরিকানদের জেলে ভর্তি করা হতো। আর এ উদ্দেশ্যেই আইনটি বানানো হয়েছিল। বুশ মুসলমানদের প্রাণের এই দাবি হৃদয় দিয়ে অনুভব করলেন। ঘোষণা দিলেন ক্ষমতায় গেলে এই আইন তুলে নেবেন। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। বুশ বিতর্কে প্রসঙ্গটি তুলে বললেন : জননিরাপত্তা আইনে সেক্রেট এভিডেন্স তিনি ডিসক্রিমিনেটরি (বিভেদমূলক) মনে করেন। ক্ষমতায় গেলে তিনি এটি উঠিয়ে দেবেন। জবাবে আলগোর বলেন- তিনি এটা মনে করেন না। আমেরিকায় মুসলিম ভোট এবারই প্রথম একপাল্লায় পড়ে। বুশ বিজয়ী হন। এবার নির্বাচনে মুসলিম ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে জয় ছিনিয়ে নেয় বলে মিডিয়া এটি গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করে। নির্বাচিত হয়ে বুশ কিন্তু মুসলমানদের দেয়া তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা তো করেনইনি উপরন্তু ৯/১১ এর মতো সুদূরপ্রসারী নীলনকশা প্রণয়ন করেন এটা নিশ্চিত করতে, যাতে ভবিষ্যতে মুসলিম ভোট ব্যাংক ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে পড়ে।

বুশের প্রত্যক্ষ মদদে যে ৯/১১ সংঘটিত হয়েছিল গত ক’বছর এই বার্ষিকীতে আমি ডকুমেন্টসহ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি নয়া দিগন্তে। উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্স এবং ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর সেই বক্তব্য, নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ভেতর থেকে সংঘটিত ঘটনা, আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী এমন ঘটনা ঘটিয়েছে এটা হতে পারে না। সরকারের এই তত্ত্বকে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি।

সার্বিক বিবেচনায় বুশের একটি তত্ত্বই প্রাধান্য পেয়েছিল : ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে তার মতো যেন মুসলিম ভোট ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে না হয়। লাদেনকে বন্দী করে বিচারের কাঠগড়ায় না এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্বের অভিজ্ঞ মহল জানে, এ কাজ লাদেনের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দি বাল্টিমোর সান এবং কানাডার দি গেজেট এ জন্য বুশ এবং সিআইএকে সরাসরি দায়ী করেছে।

ইতিহাস যাকেই দায়ী করুক, ৯/১১-এর বাহানায় সিআইএ নির্যাতন-নিপীড়নের যে তাণ্ডব চালিয়েছে তার চিত্র বিশ্ববাসী প্রমাণসহ দেখতে শুরু করেছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকেই প্রমাণ উঠে আসছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তহীন যুদ্ধের এ ভয়াল চিত্রটি বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলো- সভ্যতার সঙ্ঘাত ও যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় যুক্তরাষ্ট্র কত বেশি বাড়াবাড়ি করেছে। গুয়ানতানামো বে নামের নিপীড়ন কেন্দ্রের চিহ্ন ওবামা মুছে ফেলতে চান, কিন্তু মানবতার এই আর্তনাদ তিনি থামাবেন কিভাবে। এই ক্ষত ঢাকবেন কী দিয়ে!


লেখক : সাবেক শিক্ষক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- See more at: http://www.dailynayadiganta.com/details.php?nayadiganta=OTM3ODI=&s=Nw==#sthash.NMDE0tng.dpuf

Saturday, June 11, 2016

পদার্থ তরঙ্গ রহস্যভেদ, শক্তির নিত্যতা এবং হাল্লাজের “আমি খোদা” দাবি



পদার্থ তরঙ্গ রহস্যভেদ, শক্তির নিত্যতা এবং হাল্লাজের “আমি খোদা” দাবি
 - মুহাম্মাদ আলী রেজা


আধুনিক বিজ্ঞানে এটা পরীক্ষিত এবং প্রমাণিত যে শূন্য থেকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে যেমন কোন পদার্থ, শক্তি তৈরী সম্ভব নয় তেমনি এদের একেবারে বিনাশ বা নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব। বাস্তবে এরা যেন এক মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। উদাহরণ স্বরুপ শক্তির ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই -
ক) কয়লা পুড়িয়ে যে তাপ পাওয়া যায় তা দিয়ে পানিকে বাষ্পীভূত করে ইঞ্জিন চালানো হয়। এক্ষেত্রে কয়লার রাসায়নিক শক্তি প্রথমে তাপ শক্তিতে এবং সেই তাপ শক্তি পরে যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়।
খ) নদীতে উচু বাঁধ দিয়ে পানির স্তর উপরে উঠানো হয়। এ পানিকে বাঁধ থেকে উপচিয়ে পড়তে দিলে পানির বিভব শক্তি গতি শক্তিতে রুপান্তরিত হয় এবং গতি শক্তির সাহায্যে টারবাইন ঘুরিয়ে তড়িৎ শক্তি উৎপন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে নদীর পানির বিভব শক্তি প্রথমে গতি শক্তি এবং পরে তড়িৎ শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। ওদিকে বৈদ্যুতিক পাখায় তড়িৎ শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। বৈদ্যুতিক হিটারে তড়িৎ শক্তি তাপ শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। স্বয়ংক্রীয় ভাবে শক্তি বা পদার্থ শূন্য থেকে নতুন করে সৃষ্টি বা ধ্বংস একদম অসম্ভব যেহেতু মহাবিশ্বে বিরাজ করে পদার্থ-শক্তির নিত্যতা।

রসায়ন বিজ্ঞানের সূচনা থেকে এই ধারণা পোষণ করা হতো - কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপাদিত শক্তি এবং বিক্রিয়ায় অংশ গ্রহনকারী উপাদানের ভর সব সময় পৃথক ভাবে নিত্যতার সূত্র মেনে চলে। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে দেখান যে পদার্থ হচ্ছে শক্তির আর এক রূপ এবং একই ভাবে শক্তি ও পদার্থের আর এক রুপ। এই তত্ত্বের ফলে মহাবিশ্বে শক্তির নিত্যতা সূত্র আমাদের নিকট বর্তমানে পদার্থ-শক্তির নিত্যতা রুপে পরিচিত। পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় (যে ক্ষেত্রে অণু এবং পরমাণু পরস্পরের উপর ক্রিয়া করে) যে পরিমাণ পদার্থ রুপান্তরিত হয় তার পরিমাণ এতই কিঞ্চিত/সামান্য যে সবচেয়ে শক্তিশালী মাপযন্ত্র দিয়েও তা নিরুপনের সম্ভাবনা আশা করা যায় না। তবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহনকারী পদার্থ এবং উৎপাদিত শক্তি সব সময়ই আলাদা ভাবে নিত্য হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে পারমাণবিক বিক্রিয়ায় (যেখানে পরমাণু কেন্দ্র বা মৌলিক কনিকা পারস্পারিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটায়) যে শক্তি মুক্ত হয় তার পরিমাণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে শক্তির উদ্ভব হয় তার চেয়ে শত লক্ষ গুন বেশি। পারমাণবিক  বিক্রিয়ায় যে পদার্থ শক্তিতে রুপান্তরিত হয় তা সহজেই মাপা সম্ভব। পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে পদার্থকে শক্তিতে রুপান্তরিত করা বর্তমানে একটি রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি সামান্য পদার্থ এত বেশি শক্তি ছেড়ে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মুদ্রা যে শক্তি সরবরাহ করবে তার সমপরিমান বৈদ্যুতিক শক্তির মূল্য দাঁড়াবে এক মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮ কোটি টাকা) মাত্র কয়েকশ কিলোগ্রাম পদার্থ (পাথর বা অন্য কোন পদার্থ) যে শক্তি দিবে সেটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সারা বছর যে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার হয়ে থাকে তার সমান।  অন্যদিকে আবার পৃথিবীর সব শক্তির উৎস হচ্ছে সূর্য রশ্নি। আলোকে বলা হয় তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ। এই আলো উদ্ভিদের খাদ্য তৈরিতে মূখ্য ভূমিকা রাখে আর সব প্রাণিজগৎ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বেঁচে আছে উদ্ভিদের দ্বারা। খনিতে যে কয়লা, গ্যাস, তেল পাওয়া যায় তারও উৎস হচ্ছে উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ। ঘুরে ফিরে যে বিষয়টি এসে দাঁড়ায় সেটি হচ্ছে সব শক্তির মূলে রয়েছে সূর্যের আলো।
স্পষ্টত আমরা দেখতে পাচ্ছি আলো সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আলো দেখতে কেমন? মূলত আলো হচ্ছে এক প্রকার তরঙ্গ ঢেউ। ফরাসী পদার্থবিদ ডিব্রোগলি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন আলো তরঙ্গ হয়েও কোন পদার্থের উপর পড়লে এটি সেই পদার্থের সাথে মিশে যায়। পদার্থ এটাকে আত্মস্থ করে ফেলতে সক্ষম হয়। এতে তাঁর মাথায় আসেঃ আলোক রশ্নি তরঙ্গ হবার পরেও এটা যদি কোন পদার্থ শোষণ করে নিতে পারে তাঁর অর্থ দাঁড়ায় পদার্থ ও আলো একই প্রকৃতির কারণেই এটি সম্ভবপর হয়। ১৯২৪ সালে তিনি সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানী সমাজের প্রতি সনির্বন্ধ আবেদন জানান এই বিষয়টার প্রতি দৃষ্টি প্রদর্শনের জন্যঃ আলো হচ্ছে তরঙ্গ কিন্তু এটা যখন পদার্থে শক্তি এবং ভরবেগ সরবরাহ করতে সমর্থ হয় তাহলে একই যুক্তিতে পদার্থ রশ্নি ও আলোর মতই তরঙ্গ প্রকৃতি প্রদর্শন করবে। বিজ্ঞানী ডিব্রোগলি এই প্রস্তাবের মাধ্যমে আসলে বলতে চেয়েছিলেন, বাস্তবে আমরা  কেন ভাবতে পারব না যে একটি চলমান ইলেকট্রন অথবা অপর কোন কণাকে ও পদার্থ তরঙ্গ হিসেবে যেটাও অন্য পদার্থকে আলো রশ্নির মতো শক্তি ও দ্রুতি প্রদান করবে। ইতিহাসের ঐ সময়টিতে প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ডিব্রোগলির এক যুগান্তকারী ভবিষ্যদ্বাণীঃ পদার্থ ও কার্যত জল তরঙ্গ, আলো তরঙ্গ ইত্যাদির মতো তরঙ্গ প্রকৃতি প্রদর্শন করবে।

পদার্থের তরঙ্গায়িত রুপ বা প্রকৃতিটি সর্বপ্রথম চোখে ধরা পড়ে ডেভিসন এবং গারমানের। এ দু’বিজ্ঞানী পরীক্ষাগারে নিকেল ধাতু ফলকের উপর ইলেকট্রন রশ্নি ফেলে তাঁর সাহায্যে ইলেকট্রনের বিক্ষেপন সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। আকস্মিকভাবে বায়ুর সংস্পর্শে এসে নিকেলের উপর অক্সাইডের আবরণ পড়ায় নিকেল ফলক হতে তাপ প্রয়োগে অস্কাইডের আবরণ অপসারণ করা হলো। কিন্তু ঘটে গেলো এক অভূতপূর্ব আশ্চর্যজনক ঘটনা - বিজ্ঞানীদ্বয় ইলেকট্রনের পরিমাত্রা এর রশ্নির মত একবার সর্বাধিক আর একবার সর্বনিম্ন হতে দেখে এ থেকে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনিত হলেন - ডিব্রোগলির মতবাদ অনুসারে পদার্থকণা তরঙ্গ সদৃশ বিধায় নিকেল স্ফটিক দিয়ে ইলেকট্রন রশ্নির ব্যতিচার হয়েছে। তাঁর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ইলেকট্রন আসলে ঢেউ বা তরঙ্গ। কিন্তু ঢেউ বা তরঙ্গ বলতে কিন্তু আমরা কী বুঝিয়ে থাকি?
পানিতে সৃষ্ট তরঙ্গ সহজে আমাদের চোখে ধরা দিলেও অন্যান্য তরঙ্গ যেমন শব্দ, আলো বা বেতার তরঙ্গ কিন্তু আমরা দেখতে পাই না। একটি স্থিতিস্থাপক মাধ্যমের যে কোন অংশে আন্দোলন তৈরী হলে আদোলনটি মাধ্যমের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলে তাকে তরঙ্গ (Wave) বলে অভিহিত করা হয়। আলো তরঙ্গের বেলায় যে আন্দোলন অগ্রসর হয় তা কোন জড় পদার্থের গতির জন্য হয় না। এটা হয়ে থাকে তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্রের গতির জন্য। এ কারণে মাধ্যমের কোন সাহায্য ছাড়াই সূর্য থেকে পৃথবী পর্যন্ত মুক্তভাবে আলোর বিস্তার লাভ সম্ভব হয়ে থাকে। এখানে উল্লেখ্য, তরঙ্গ যখন পথ চলে সেই সাথে কিন্তু সংশ্লিষ্ট মাধ্যমটি সামগ্রিকভাবে স্থানান্তর হয় না। মাধ্যমের বিভিন্ন অংশগুলো কেবল সীমিত পথে তাদের সাম্য অবস্থানের দু পাশে এদিক-ওদিক স্পন্দিত হতে থাকে।

পদার্থ কণিকা ইলেকট্রন ঢেউ/তরঙ্গ ছাড়া আর কিছু নয় এই অদ্ভূত আবিস্কারের পর অন্য সব কণিকার ক্ষেত্রে যেমন প্রোটন, নিউট্রন এবং সব ধরণের পরমাণুর বেলায়ও পর্যায়ক্রমে এই তরঙ্গের আচরন আবিস্কৃত হতে থাকে। ১৯৯৪ তে আয়োডিন অণুর ক্ষেত্রে তরঙ্গায়িত এই ধর্ম পরিদৃষ্ট হয় যে অণুটি ইলেকট্রনের চেয়ে কেবলমাত্র পাঁচ লাখ গুন ভারীই নয়, গঠনে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এদিকে ১৯৯৯ সালে ৬০ অথবা ৭০ টি কার্বণ অণু দিয়ে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের রসায়নবিদরা দেখতে ফুটবলের মতো যে কৃত্রিম অণু ফুলারেঞ্জ (বাকীবলস) তৈরী করেন এরাও আলোর মতো তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করে। সম্প্রতি নভোচারীরা বাস্তবে মহাকাশেও প্রকৃতিতে এই অণুর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। উল্লেখ্য, ক্ষুদ্র কণা যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, অণু, পরমাণু তরঙ্গ প্রকৃতি প্রদর্শন করলেও বড়  এবং জটিল বস্তুর ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের ফিরে যেতে হয় সেই অতি পরিচিত নন কোয়ান্টাম
জগতে। এর অর্থ দাঁড়ায় ইলেকট্রন বা অন্য সব কণা, অণু বা পরমাণু নিজেদের মধ্যে ব্যতিচার তৈরীতে সফল হলেও বড় ধরণের বস্ত উদাহরণ স্বরুপ কাঠ বিড়ালি কিন্তু পরস্পরের মধ্যে ব্যতিচার তৈরীতে অক্ষম। আর এটা প্রকৃতিতে এজন্য সম্ভব নয় যা প্রানীদের অস্তিত্ব রক্ষারই মোক্ষম উপায় এবং বেচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক।

সুবিখ্যাত বিজ্ঞানী শ্রোয়েডিংগার তার পরমাণুবাদে জড় স্বভাবকে একদম বাদ দিয়ে পরমাণু এবং তার উপাদান ইলেকট্রন, প্রোটনকে শুধু ঢেউ বা তরঙ্গের গুচ্ছরুপে কল্পনা করেন, যা পরিশেষে তরঙ্গ বলবিদ্যার উদ্ভব ঘটায়। পদার্থের তরঙ্গায়িত এই ধর্মের জন্য আজকের কোয়ান্টাম বিজ্ঞান বলছেঃ কণিকা এবং তরঙ্গের মধ্যে দ্বিত্ব রয়েছে। কোন কোন উদ্দেশ্যে কণিকাগুলোকে তরঙ্গরুপে চিন্তা করলেই উত্তম। অন্যদিকে কোয়ান্টামের অনিশ্চয়তা নীতিটি আবার দাবী করে যে, কোন কণিকার অবস্থানও দ্রুতি নির্ভুল ভাবে জানা বা নির্ণয় করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়।  এর কারণ কোন কিছুকে সঠিক/নিশ্চিত ভাবে জানার জন্য তার অবস্থান এবং সেই অবস্থানে তার বেগও জানতে হবে। কিন্তু কোয়ান্টামের অনিশ্চয়তা তত্ত্বটি পরিস্কার ভাবে বলে দিচ্ছেঃ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন একটি কণার অবস্থান যত নির্ভুল ভাবে মাপার চেষ্টা করা যাবে, তার দ্রুতির মাপও হবে তত কম নির্ভুল এবং এর বিপরীত ও সত্য হবে। আবার অনিশ্চয়তার এই সীমা কনিকাটির অবস্থান মাপনের উপরও নির্ভরশীল নয়। সুতরাং হাইজেনের এই তত্ত্বটি হয়ে দাড়িয়েছে বিশ্বের একটি মূলগত অনতিক্রমণীয় ধর্ম। প্রকারন্তরে তাই স্পষ্টত মনে হচ্ছে সব কিছু যেন এক অদৃশ্য জগতের হাতছানিতে বিদ্যমান, এর রহস্য ভেদ আমাদের এই সর্বশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমেও সম্ভব হবে না এবং তার কোন সুযোগ প্রকৃতি আমাদের জন্য খোলা রাখেনি। প্যানইথিজম বা অদ্বৈতবাদের ধারণার সাথে আজকের কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের কোথাও যেন একটা যোগসূত্র খুজে পাওয়া যায়। দুনিয়ার বিভিন্ন ধর্মের সূফী/যোগীদের মধ্যে অদ্বৈতবাদের একটি ধারা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। প্যানইথিজম এর এই ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি দার্শনিক মতবাদও, ইসলামে সূফীদের এই অদ্বৈতবাদ বা ফানাহফিল্লাহর (আত্ম বিলুপ্তির) পথকে সাংঘাতিক পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অদ্বৈতবাদের একটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ঘটনা হচ্ছে মধ্যযুগে মনসুর আল হাজ্জাজের আনাল হক দাবি। এ দাবির মাধ্যমে তিনি সমাজে তুলকালাম বাধিয়ে দেন। হক আল্লাহ তাআলার গুনবাচক নাম হওয়ায় আনাল হকের তাৎপর্য মনে করা হয় নিজেকে খোদা বলে দাবি করা যেটা কুফরি বা খোদাদ্রোহীতার সমপর্যায়ে পড়ে।  হাল্লাজের একটি কবিতা হচ্ছে, “আমি সে (স্রষ্টা) যাকে ভালোবাসি আমি। যাকে আমি ভালোবাসি সে আমি (স্রষ্টা)।” এ দাবি প্রত্যাহারের জন্য প্রচন্ডভাবে চাপ প্রয়োগ করা হলে  অস্বীকার করে তিনি বলেন, “যে সত্যের খোজ আমি লাভ করেছি তাকে মিথ্যা বলব কীভাবে?” যখন তাকে মৃত্যুদন্ডের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, সেখানে জড়ো হওয়া লোকদের দিকে তাকিয়ে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনাটি তিনি করেন - “যারা তাদের ধর্মের প্রতি প্রবল ভাবাবেগের বশবর্তি হয়ে এবং তোমার আনুকূল্য লাভের আশায় এভাবে জড়ো হয়েছে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে, হে প্রভু তাদের মাফ করে দাও এবং তাদের প্রতি করুনা করো। আমার কাছে যথার্থই তুমি যা ফাঁস করেছো, যদি তাদের কাছে ফাঁস হতো, তারা এটা করত না, যা করছে। তাদের কাছে যা গোপন রেখেছ আমার কাছে তা গোপন না করলে আমাকে এই যন্ত্রণা ভোগ করতে হত না।” (সুত্রঃ  ক্যারেন আর্মস্ট্রং এর “অ্যা হিস্ট্রি অব গড” যেটি যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ বিক্রিত একটি বই।) ইসলামি বিশ্বের একজন শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদ মুজাদ্দিদ ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) যুক্তি দেখান, “হাল্লাজ ব্লাসফেমাসের (খোদাদ্রোহীতার) অভিযোগে অভিযুক্ত না হলেও তার কাজটি ছিলো অবিজ্ঞের মতো।” আনাল হক (আমি স্রষ্টা) অথবা ফানাফিল্লাহ (আত্মবিলুপ্তি) এসব ব্যপারে মুজাদ্দিদ আলফেমানি (রহঃ) এর অভিমত, “আধ্যাতিক সাধনার এক পর্যায়ে সাধক দেখতে পান সৃষ্টি এবং স্রষ্টাতে কোন বিভেদ নেই। সব কিছুতেই সে শুধু স্রষ্টাকে দেখতে পায়। এর পরের স্তরটি জিল্লিয়াত, যেখানে সাধক দেখতে পান সব কিছুই মহান আল্লাহ রব্বুলের নূরে (আলোতে/তরঙ্গে) দোল খেয়ে ফিরছে” নভোমন্ডল এবং ভূমন্ডলের সব কিছুই আল্লাহ পাকের নূরে সৃষ্ট - অনেকের কাছে এটা প্রবাদও। “আল্লাহু নূরু ছামাওয়াতি অল আরদ” - আয়াতটির ব্যাখ্যায় অনেকে এরকমটি বুঝিয়ে থাকেন বা মনে করেন। মুজাদ্দিদ আলফেসানির (রহঃ) মতে, “আধ্যাত্মিক সাধনার তৃতীয় বা শেষ স্তরটি হচ্ছে আবদিয়াত, যে স্তরে সাধক বুঝবে আল্লাহ পাক মহা মহীয়ান, চির গরীয়ান। অনুভূতি দিয়ে তাকে ধরা যায় না। সব চিন্তা, অনুভূতি ব্যর্থ হয়ে তার দুয়ার হতে ফিরে আসে।”

স্পষ্টত এখানে লক্ষণীয় - অত্যাধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সাথে আধ্যাত্মিক সাধনা জগতের মধ্যকার এক গভীর যোগসুত্র আমাদের চোখে ভেসে উঠেছে। পদার্থ ও শক্তি দিয়ে গঠিত মহাবিশ্ব; শক্তি ও ভরের নতুন করে সৃষ্টি নেই, নেই কোন বিনাশ, আছে শুধু রুপান্তর। তার অর্থ সবই অবিনশ্বর।  এ সবই আবার অদৃশ্য জগতের থেকে আগত। আর সবই আলো/তরঙ্গ/নূর। সর্বত্রই স্রষ্টা বিরাজমান। সব চিন্তা, সাধনা, গবেষণা তার দুয়ার হতে ফিরে আসে।
“তাকে জানা সম্ভব নয়। এটাই তাকে জানার একমাত্র পথ।” - প্রথম খলিফা আবুবকর (রাঃ)।

মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভাষায়, “নিশ্চই এর পেছনে রয়েছে এক অকল্পনীয় মহাজ্ঞানী সত্ত্বার এক রহস্যময় অভিপ্রেত। বিজ্ঞানীর দুরভিসারি জিজ্ঞাসা সেখানে বিমুঢ় হয়ে যায় - বিজ্ঞানের সমাগত চূড়ান্ত অগ্রগতিও সেখান থেকে স্তব্ধ হয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই অনন্ত মহাজাগতিক রহস্যের প্রতিভাস বিজ্ঞানীর মনকে এই নিশ্চিত প্রত্যয়ে উদ্বেল করে তোলে, এই মহা বিশ্বের একজন নিয়ন্ত্রা রয়েছেন। তিনি অলৌকিক জ্ঞানময়, তাঁর সৃষ্টিকে অনুভব করা যায় - কিন্তু তাকে কল্পনা করা যায় না।”

বিশিষ্ট প্রানপদার্থবিদ ইবারসোল্ডের মতে, “বিজ্ঞানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা, পরমাণু, নক্ষত্র, ছায়াপথ, প্রাণ ও সকল অলীক গুণের অধিকারী মানুষ কেন রয়েছে এই প্রশ্ন কখনও ব্যাখ্যা করবে না। বিজ্ঞান এই মহাবিশ্বের জন্ম সম্পর্কে আপাত দৃষ্টিতে খুবই যুক্তিযুক্ত মহাপ্লাবনিক একটা তত্ত্ব দাঁড় করাতে পারে, তারই ফলে ছায়াপথ, নক্ষত্র, সবকটি গ্রহও পরমাণু সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করতে পারে। কিন্তু কোথা থেকে এই সৃষ্টির জন্য জড় পদার্থ আর শক্তি এসেছে এবং কেন এই মহাবিশ্ব এমনভাবে গঠিত ও সুশৃঙ্খলাবদ্ধ, সে বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা বা ধারনা বিজ্ঞানে জুটবে না।” নিউজ লিঙ্ক
লেখকঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক
পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক।

The Qur'an and Outer Space
SPACE , the LOWEST JANNAT [paradise] & TASTE OF IMAN [faith] by M. Ali Reza [Bangladesh]

Imam Gazzali wrote in the middle ages: A person who has no knowledge of space/universe, his taste of Iman is comparable to an impotent man who has no feelings of making love's extraordinary extreme enjoyment. After completion of the punishment of Jahannam, hell, the least person would get space of Jannat [paradise] that is 10 times the size of the world. Then could we imagine the size of space for the best rank of heavenly people.
LATEST SCIENCE ABOUT THE UNIVERSE:
Three fourth part of Earth is water; half of the earth's people live on one hundredth part of the land of Earth (recent report of NASA).Our Sun is an average ordinary star. The Sun is the closest star to Earth and the center of our solar system. The sun has been producing light energy for about 4.6 billion years and will do so for another 5 billion or so. The Sun measures 1.4 million km in diameter which means that 109 Earths could fit across its surface and 1.3 million Earths would fit inside it. The Sun is nothing but a star. On the other hand, a galaxy is a vast group of stars built together. It is estimated that there are 100-125 billion in the Universe . They are not scattered randomly but exist in clusters, vast distances apart. All the galaxies together take up just two millionths of space.
Size & shape of galaxies:
The largest are more than a million light years across (One light year =9.4 trillion km).The smallest, called dwarf galaxies, are a few thousand light-years wide.
Andromeda measures 250,000 light-years from side to side. Trillions of stars are arranged in one of four basic shapes: spiral, barred spiral, elliptical, or irregular. Each star follows its own orbit around the center of the galaxy. Stars in a spiral galaxy typically take a few hundred million years to make an orbit. A single galaxy is made of billions or trillions of stars. The most distant object that can be seen by the naked eye from the Earth is Andromeda galaxy which is 2.9 million light years from us.
Expanding Universe:
In astronomical observations of stars, galaxies and other sources of light, we can determine how fast the sources are moving, either directly away from us or directly towards us, by measuring the Doppler shift of the light that reaches us. If a certain star were at rest relative to us, we would detect light from it with a certain proper frequency. However, if the star is moving either directly away from us or directly toward us, the light we detect has a frequency that is shifted from the proper frequency. This is due only to its motion directly toward us or away from us. If the source is moving away from us, the Doppler shift is called a red shift that is the wavelength increased. Thus it is possible to measure the relative speeds at which galaxies are approaching us or receding from us by measuring the shifts in the wavelength of the light they emit. If we look only at distant galaxies, beyond our immediate galactic neighbors, we find a astonishing fact. They are all moving away (receding) from us. In 1992 Hubble established a connection between the apparent speed of recession of a galaxy and its distance from us – namely, that they are directly proportional. It shows,  a galaxy a million light years from us is rushing away at about 22.4 kilometers per second, while another galaxy two million light-years distant is flying away from us twice as fast, at 44.8 kilometers per second.. The discovery of the expanding of the Universe is one of the greatest revolutionary discoveries of the twentieth century.
More importantly, Al Quran narrates, “With power did We construct the Universe. Verily, We are able to extend the vastness of space thereof.” : Surah 51-Adh-Dhariyat; Ayat 47.

Again we see, all the galaxies together take up just two millionth of space. Even in the present context of the universe, 10 times of the Earth for the lowest one is nothing but a simple matter.

Thursday, May 26, 2016

বুশের ‘৯-১১’ সুপার ড্রামা

Thursday, September 11, 2014


বুশের ‘৯-১১’ সুপার ড্রামা

বিষয়টি আপাত-দুর্বোধ্য ও জটিল মনে হলেও বাস্তবতা হচ্ছে- তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের সুদূর পরিকল্পিত ৯-১১ সুপার নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়ায় প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হয়ে যায় : [সর্বনাশ!] ইসলাম এ দেশে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম। এটি আরো তীব্র হয়ে ওঠে যখন কিনটন সরকার হোয়াইট হাউজে স্থায়ীভাবে ইসলামের প্রতীক চাঁদ-তারা পতাকা ওড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার পর থেকে দু’টি ধর্মীয় পতাকা হোয়াইট হাউজে উঠানো হতো। দেখতে দেখতে মুসলমানদের সংখ্যা ইহুদিদের টপকিয়ে যেতে দেখা যায়। এখন তিন ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়ছে। জন্স হপকিন্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। বাল্টিমোরে এর দু’টি ক্যাম্পাস। হোমউড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির নিচ তলার দেয়ালে পরিবেশিত একটি নিউজ আমার নজরে পড়েছিল : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। মিডিয়ায় দেখি : এই ধর্মান্তরিতদের মধ্যে বেশির ভাগ মহিলা। এ সময় একটা বই হাতে পাই : ‘ডটার অব অ্যানআদার পথ’। লিখেছেন একজন খ্রিষ্টান মা। বইটিতে বিবৃত হয়েছে লেখিকা মিসেস অ্যানওয়ের অভিজ্ঞতাসহ নিজ কন্যা ও আমেরিকান অন্যান্য রমণীর মুসলমান হতে চাওয়ার কাহিনী। বইটি এত জনপ্রিয়তা পায় যে, প্রকাশের পরপরই ফরাসি ভাষায় ছাপা হয় ফ্রান্স থেকে। পরে বাংলাদেশে এসে এর বাংলা অনুবাদ ‘অন্য পথের কন্যারা’ দেখতে পাই।
তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এতে আল গোরের প্রতিদ্বন্দ্বী বুশ। নির্বাচনের বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি ছিল রোমাঞ্চকর। বিতর্কের একটি বিষয় থেকে এটা স্পষ্ট। পরবর্তীকালে কেন বুশ সেই বিতর্কিত ক্রুসেডের ঘোষক এবং নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পক হলেন? ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলেন গোঁড়া ইহুদি লিবারম্যানকে। বুশের কাছে স্পষ্ট হলো, ইহুদি ভোট আল গোর পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবি খুবই সক্রিয় ও সুসংগঠিত। সে দেশে সাধারণত খ্রিষ্টান ভোট দুই ভাগে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত হয়ে ভোটের ভারসাম্য বজায় রাখে দুই দলের মধ্যে। ব্যতিক্রম হচ্ছে, ইহুদি ভোট যে দিকে মোড় নেয়, তারাই বিজয়ের হাসি হাসে। ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো ইহুদি (অখ্রিষ্টান) হোয়াইট হাউজের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। বুশ জয়ের বিকল্প পথ খোলা না পেয়ে দিশেহারা হয়ে মুসলমানদের দ্বারস্থ হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই প্রথম একজন প্রার্থী সরাসরি মুসলমানদের কাছে ভোট চাইলেন। সেই সময়ে মুসলমানদের প্রাণের দাবি ছিল, জননিরাপত্তা আইনে সংযুক্ত ‘সিক্রেট এভিডেন্স’ রহিত করা। আইনটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংযুক্ত হয়েছিল মুসলমানদেরকে সামাজিকভাবে জব্দ এবং কোণঠাসা করার জন্যই। এই সিক্রেট এভিডেন্সের দোহাই দিয়ে বা এর ফাঁকফোকড় তৈরি করে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকদের জেলে পাঠানো হতো। বুশ দেখলেন, এ বিষয়ে কথা বললে সব মুসলমান ভোটারের ভোট বাগানো সম্ভব হবে। বিতর্কের সময় তিনি সরাসরি বললেন : ‘নিরাপত্তা আইনে সিক্রেট এভিডেন্সকে বৈষম্যমূলক মনে করি। ক্ষমতায় গেলে এটি বাতিল করব।’ জবাবে আল গোর বলেছিলেন : ‘আমি এটাকে বৈষম্যমূলক মনে করি না।’ মুসলমান ভোটারদের মনে হলো, বুশ তাদের পক্ষ নিয়েছেন। এই প্রথম মুসলমানেরা জোটবদ্ধভাবে একদিকে ভোট প্রয়োগ করেন। এমনকি বুশের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারে জড়িয়ে পড়েন। শেষে ইহুদি লবির সাথে প্রতিযোগিতায় বিজয় ছিনিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, মুসলমানেরাও মার্কিন মাটিতে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম। মুসলিম ভোট ব্যাংকের শক্তির মহড়া, এটাকে দেখা হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে। প্রচারমাধ্যম এটা লুফে নিলো। ইনভেস্টরস বিজিনেস ডেইলি এক নিবন্ধে লিখেছিলন ‘আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা ছিল বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি।’ এর কপি বিভিন্ন মসজিদে বিলি করা হয়, যার একটি কপি আমার কাছেও আছে।
‘নয়-এগারো’তে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হামলা হলেও এর নীলনকশা শুরু হয়েছিল ১৯৯৩-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি এই একই প্রতিষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এভাবে তখন এটা প্রমাণ করার চেষ্টা চলে যে, জাতি হিসেবে মুসলমানরাই সন্ত্রাসী। তখন রিডার্স ডাইজেস্ট এক নিবন্ধে লিখেছিল, হামলার জন্য বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র বাছাই করার লক্ষ্য হলো, বিশ্ব সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালানো। কারণ, এখানে সব দেশের লোকেরা অবস্থান করে। সিএনএন-এর প্রথম রিপোর্টে স্বীকার করা হয়ঃ যদি বোমা হামলাকারীরা বাণিজ্যকেন্দ্র সমূলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করত, তাহলে বিস্ফোরক রাস্তার সমতলে বসাত। ফলে শত শত মানুষ নিহত বা জখম হতো। বাল্টিমোর নিউট্রেন্ড পত্রিকা লিখেছে, বোমা হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়, যার ফলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হয় এবং এর আওতার মধ্যে পড়ে সবচেয়ে কম লোক। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে প্রথম হামলাটি আসলেই ছিল এক আগাম কৌশল। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, প্রচারমাধ্যমে স্পর্শকাতর অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ ব্রান্ডে চিহ্নিত করে তাদের ব্যাপারে আমেরিকানদের সতর্ক ও উত্তেজিত করা। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে বিরামহীন মিডিয়াক্রুসেড, যার লক্ষ্য ছিল মুসলমানদেরকে ‘সন্ত্রাসী জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা।
নাইন-ইলেভেনে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দু’টি যাত্রীবাহী বিমান আছড়ে পড়েছিল নিউ ইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে। অতঃপর আগুন, ধোঁয়া; তাসের ঘরের মতো দু’টি টাওয়ার ভেঙে পড়ে। ‘নয়-এগারো’র ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার দশক পূর্তির পরেও বিবিসি, রয়টার, এএফপি পরিবেশিত সংবাদে প্রশ্ন করা হলো : আসলে কী ঘটেছিল ২০০১-এর এই দিনে? সত্যিই কি আলকায়েদা মার্কিন শৌর্যে আঘাত হেনেছিল, নাকি সবই পাতানো?  বিষয়টি রহস্যময় রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ নিউইয়র্ক ও পেন্টাগনে সে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ভেতর থেকেই সংঘটিত। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ারে ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষার পর নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে সেখানে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের। জোন্স বলেন, আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সরকারের এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি। ‘ওপেন’ হলো ক্যালিফোর্নিয়ার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এর সদস্যদের মধ্যে আছেন নোয়াম চমস্কি, পিট সিগার, আছেন সাংবাদিক, সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সফটওয়্যার, সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। সিএনএন-এর ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ‘ওপেন’ দাবি করেছেন বিমানের নাক টাওয়ারে স্পর্শের মুহূর্তেই বিশাল বিস্ফোরণ ঘটেছে ককপিটে। বিমানের ককপিটে কী এমন থাকতে পারে যার ফলে সেখানে এ রকম বিস্ফোরণ ঘটতে পারে  ‘ওপেনের’ প্রশ্ন। ট্রেড সেন্টারের দু’টি টাওয়ারে প্রতিটি বিমানের ধাক্কা লাগার ঠিক আগমুহূর্তেই একই ধরনের আগুনের ঝলকানি দেখা গেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়া কোনোমতেই এ রকম নিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়। বিমানে কি তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র ছিল? গোটা বিশ্ব টিভিতে দেখেছে, গল গল করে ঘন সাদা ধোঁয়ার আস্তরণের মধ্যে ভেঙে পড়েছে ট্রেড সেন্টারের টাওয়ার। ‘ওপেন’-এর প্রশ্ন ' সাদা ধোঁয়া কেন?' তাদের দুই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ কানাডার কারবেল এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ফ্রেডি সি¤প্যাকসান জানাচ্ছেন, বিস্ফোরকের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অ্যামোনিয়াম হাইড্রেট, কার্বন ও সালফারের মিশ্রণ ছিল। তা না হলে এই পরিমাণ ছাইবিহীন সাদা ধোঁয়ার জন্ম হতে পারে না। তাহলে কি দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল টাওয়ারে? একটি অত্যাধুনিক নজরদারি ক্যামেরায় তোলা একটি ছবির প্রতিটি ফ্রেম এক সেকেন্ডের ৮০০ ভাগে ভাগ করে ‘ওপেন’ দেখাচ্ছে, নীল আকাশ আর তার পরেই পেন্টাগনের এক বাহুতে বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ; ভয়াবহ আগুন। কিন্তু বিমানের কোনো চিহ্ন নেই। তা হলে বিমান ভেঙে পড়ল কোত্থেকে?
কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ট্রোর মতে, ৯-১১ ঘটনাটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র। পেন্টাগনে আসলে বিমান নয়, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কারণ, বিমানের যাত্রীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। যাত্রী ও ক্রুদের মৃত দেহ পাওয়া গেলে DNA পরীক্ষা দ্বারা অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা হতো। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ইরানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘নয়-এগারো’ হামলা ছিল গোয়েন্দা সংস্থার জটিল দৃশ্যকল্প ও কর্মকাণ্ড। এ হামলায় তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির কথা বলা হলেও তাদের নাম ও তালিকা কখনো প্রকাশ করা হয়নি।’ মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ টুইন টাওয়ার হামলার দশক পূর্তিতে বলেন, ুব্ধ আরব মুসলমানদের পক্ষে গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একসাথে চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানো কোনো পরিস্থিতিতেই সম্ভব হতে পারে না।’ টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্য বর্ণনা করে তিনি বলেন, এ দু’টি দালান আশপাশে হেলে বা কাত হয়ে পড়ার বদলে ভেঙে নিচের দিকে দেবে গেছে। বিমানের আঘাতেই ধসে পড়েছে বলে মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে ভবন দু’টি ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। তৃতীয় একটি ভবন একই কায়দায় ধসে পড়লেও এই ভবনে কিন্তু কোনো বিমানই আঘাত হানেনি। আশপাশের ভবনগুলোর কোনো ক্ষতি ছাড়া কিভাবে তৃতীয় ভবনটি ধসে পড়ল? আর পেন্টাগনে যে বিমানটি হামলা করেছিল, তার ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পাওয়া গেল না’ কিংবা আরোহীদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের খোঁজ মিলল না কেন? একই দিনে আর একটি বিমান যুক্তরাষ্ট্রের একটি খেলার মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও তার কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি  এর উল্লেখ করে মাহাথির বলেন যে, বিমানটি কি শেষ পর্যন্ত হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? মার্কিন গণমাধ্যম ‘৯-১১’ ঘটনায় রহস্যজনক নীরবতা বজায় রাখে। এর উদ্দেশ্য কী?
২৮-৯-২০০১ করাচির দৈনিক উম্মতের সাথে এক সাক্ষাৎকারে উসামা বিন লাদেন বলেছিলেন : ইতঃপূর্বে বলেছি, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্ঘটিত ৯-১১ হামলায় জড়িত নই। মুসলিম হিসেবে যথাসম্ভব মিথ্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এ হামলাগুলো সম্পর্কে কোনো কিছুই জানতাম না। তা ছাড়া নিরীহ মহিলা, শিশু ও অন্যান্য মানুষের হত্যাকাণ্ডকে প্রশংসনীয় বিষয় বলে মনে করি না। নিরীহ মহিলা, শিশু ও অন্য লোকজনকে ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার জন্য ইসলামের কঠোর নির্দেশ রয়েছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রই মহিলা, শিশু ও সাধারণ মানুষের সাথে সব ধরনের দুর্ব্যবহার করছে।’ অনেকেই মনে করেন, বিন লাদেনকে আটক না করে হত্যা করা হয়েছে শুধু এ জন্য যে, তার 
বিচার হলে অনেক তথ্য বা রহস্য ফাঁস হয়ে যেত, যা কখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুখকর 
হওয়ার নয়।
অনেকের অভিমত, বুশের নির্বাচনী আশ্বাস পেয়ে মুসলিম আমেরিকানরা একজোটে ভোট দিয়ে বুশকে ক্ষমতায় আনে বিধায় তারা আর কখনো যাতে আমেরিকার মাটিতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করতে না পারে, তা চিরস্থায়ীভাবে নিশ্চিত করার জন্য ঘটানো হয় ৯-১১ নারকীয় তাণ্ডব। কানাডার দি গেজেট পত্রিকায় ডেভিড গোল্ডস্টেইন টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য খোদ বুশকে দায়ী করে একাধিক বাস্তবসম্মত যুক্তি দিয়ে বলেছেন এ কাজ কোনোভাবেই বিন লাদেনকে দিয়ে সম্ভব নয়। 
লেখক : সাবেক শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত। 
http://www.dailynayadiganta.com/details.php?nayadiganta=Njk3NTU=&s=Nw==

প্যারিস সন্ত্রাস ও বুশের ৯/১১ কি একই সূত্রে গাঁথা?

Friday, December 18, 2015

প্যারিস সন্ত্রাস ও বুশের ৯/১১ কি একই সূত্রে গাঁথা?

প্যারিস সন্ত্রাস ও বুশের ৯/১১ কি একই সূত্রে গাঁথা?
- মুহাম্মাদ আলী রেজা

ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে গোপন তথ্য ফাঁস করে সাড়া জাগানো আলোচিত ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকস’ প্যারিসে হামলার জন্য আমেরিকা ও তার মিত্রদের অভিযুক্ত করেছে। অনলাইনে এক টুইট বার্তায় আরো বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে সিরিয়া ও লিবিয়ায় চরমপন্থীদের অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয়ার ফল এটি। পরের দিন আর এক টুইট বার্তায় ওয়েব সাইটটি বলে, প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় শতাধিক নিহত হয়েছে। অন্য দিকে ইরাক ও সিরিয়ায় দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এই দুই মৃত্যুর সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যে উগ্রপন্থীদের প্রতিপালন করছে তার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
প্যারিসে একযোগে ছয়টি স্থানে হামলা। এতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় প্যারিস। ১২৮ জন নিহত ও কয়েক শ’ মানুষ আহত হয়। ইসলামি স্টেটের ছদ্মাবরণে এই যে ভয়াল তাণ্ডব, প্রশ্ন ওঠে আইএসের এ ভয়ঙ্কর রূপের সাথে এক হাজার ৩০০ বছরের ইসলামি সভ্যতা ও জগতের সাথে কোনো ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়! নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ এবং হত্যার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সরব হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ইমাম (বিবিসি)।
‘ইতঃপূর্বে আমি বলেছি ৯/১১ হামলায় আমি জড়িত নই। মুসলিম হিসেবে আমি যথাসম্ভব মিথ্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। বিশ্ব বাণিজ্য-কেন্দ্রে হামলার ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না। তা ছাড়া নিরীহ মহিলা, শিশু ও অন্য লোকজনের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ আছে ইসলামের। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এ নীতি প্রযোজ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই মহিলা, শিশু ও সাধারণ মানুষের সাথে সব ধরনের দুর্ব্যবহার করে যাচ্ছে।’
(পাকিস্তানি দৈনিক উম্মতের (করাচি) সাথে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে সাক্ষাৎকারে ওসামা বিন লাদেন।) প্রকৃত প্রস্তাবে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার জন্য লেলিয়ে দিয়ে দুনিয়ার সব মুসলিম উম্মতের গায়ে আইএস বর্বরতার মোহর দেয়ার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠী।
প্রকৃত পক্ষে প্যারিসে যে বর্বরতা ঘটানো হয়েছে সেই একই চিত্র ফুটে উঠেছিল বুশের ৯/১১ নাটক মঞ্চস্থে। ৯/১১ ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার এক দশক পূর্তিতে বিবিসি, রয়টার ও এএফপি পরিবেশিত সংবাদ হচ্ছে- ‘আসলে কী ঘটেছিল ২০০১ সালের এ দিনে? সত্যিই কী আল কায়েদা সে দিন মার্কিন শৈর্যে আঘাত হেনেছিল নাকি সবই পাতানো। সে প্রশ্ন রয়ে গেছে অনেকের কাছে।’
প্রেসিডেন্ট ডব্লিউ বুশকে কেন ৯/১১ নাটক মঞ্চস্থ করতে বিশ্ববাসী দেখল, আর কেনই বা তিনি এ পথ বেছে নিয়েছিলেন?
জন্মলগ্ন থেকেই য্ক্তুরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতি ইহুদিলবি প্রভাবিত এবং বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত। বুশ যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেন সে সময় বড় ধরনের এক অঘটন ঘটে যায়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আলগোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কট্টর ইহুদি লিবারম্যানকে মনোনীত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন অখ্রিষ্টান প্রার্থী হন। নিশ্চিতভাবে আমেরিকান ইহুদিদের সব ভোট আলগোরের পাল্লায় যাচ্ছে আর এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি মাত্র পথ অবশিষ্ট ছিল- ইহুদিদের ভোটের বিপরীতে সব আমেরিকান মুসলিমদের ভোট। আর ঠিক এই সময়ে হোয়াইট হাউসে চাঁদ-তারা পতাকা ওঠানো হয়েছে। স্বাধীনতার পর হোয়াইট হাউজে খ্রিষ্টান ও ইহুদি এই দুই ধর্মের পতাকা উড়ত। কারণ তারা সংখ্যায় অনেক ছিল। দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে ইহুদিদের সংখ্যা টপকিয়ে যায় মুসলমানেরা। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয় এখন থেকে তিন ধর্মের পতাকা উড়বে হোয়াইট হাউসে। ওই সময় মিডিয়ায় সাড়া জাগিয়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত বেড়ে চলা ধর্ম ইসলাম। জাস হপকিন্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয়। বাল্টিমোরে এর দুইটি ক্যাম্পাস। আমি হোম উড ক্যাম্পাসে গবেষণা করছি। এখানে লাইব্রেরির বেসমেন্টের দেয়ালে একটি নিউজ আমার দৃষ্টিতে আসে। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করছেন। বাইরে এসে পরে জানতে পারি পুরুষদের চেয়ে মহিলারা বেশি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন। 'Daughters of Another Path' নামে একটি বই হাতে পাই। দেখতে পাই এই বইটিতে ফুটে উঠেছে আমেরিকান রমণীদের ইসলাম গ্রহণের কথামালা। বইটি এত জনপ্রিয় যে, সাথে সাথে ফ্রেঞ্চ ভাষায় ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত হয়। ইন্টারনেটে একটি মেয়ে লিখেছে- ‘বইটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি। এ তো আমারই কথা। প্রথমে আব্বা আম্মাকে পড়তে দিয়ে বলি, এ বইতে পাবে, কেন আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছি।’ বইটি আমার এত ভালো লেগেছিল যে ঠিক করলাম অনুবাদ করব। এসে দেখি ২০০০ সালেই বইটি বাংলায় ঢাকা থেকে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইট। বইটিতে আছে আমেরিকান মেয়েরা কেন পরিত্যাগ করছে তাদের এত দিনকার খ্রিষ্টীয় পরিবেশ আর পছন্দ করছে ইসলামকে। যে ধর্মে আছে শৃঙ্খলা, আত্মসমর্পণ ও ভিন্নরূপ হওয়ার বিধান।
আমেরিকায় দ্রুত বেড়ে চলা ধর্ম হওয়ায় মুসলমানদেরকে সমাজে বিব্রত অবস্থায় ফেলতে বা কোণঠাসা করার মানসে আইনে প্রয়োগ করা হয় Secret evidence। এই গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে মুসলমানদের জেলে ঢোকান হতো। আর এই Secret evidence-এর প্রয়োগ শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রেই দেখা যেত। এখানকার সব আমেরিকান মুসলিমদের একমাত্র দাবি ছিল এটির অবসান। বুশের নির্বাচনে জেতার জন্য দরকার ছিল মুসলিম ভোট। তিনি এই সুযোগটি কাজে লাগান। আলগোরের সাথে নির্বাচনী বিতর্কে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সিক্রেট এভিডেন্সকে তিনি Discriminitory (পক্ষপাত/ বৈষম্যমূলক) মনে করেন। আলগোর জবাবে বললেন, তিনি তা মনে করেন না। বাস্তবে ঐতিহাসিকভাবে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জাতীয় নির্বাচনী বিতর্কে মুসলমানদের পক্ষে কথা বললেন। তার বিনিময়ে আমেরিকান মুসলমানেরা এক জোট হয়ে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে বুশের পক্ষ নেন। দরজায় কড়া নেড়ে শেষে ইহুদি লবির বিপরীতে বুশকে বিজয়ী করেন। আগে মুসলমানেরা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে ভোট দিতেন; জোটবদ্ধভাবে এক পাল্লায় এবারই প্রথম। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ইনভেস্টরস ডেইলি এক নিবন্ধে মন্তব্য করে আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা বিজয়ের চেয়ে বেশি ছিল। মসজিদে এটি বিতরণ হচ্ছিল যার একটি আমি পাই।
মুসলিম আমেরিকান ভোটে বিজয়ী বুশ উপলব্ধি করলেন- এভাবে চললে একদিন মুসলমানেরা ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট ব্যাংকই মূল ক্ষমতা। দ্রুত বেড়ে ওঠা ধর্ম ইসলামকে ঠেকাতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।
ডেভিড গোল্ডস্টেইন কানাডার মন্ট্রিল থেকে প্রকাশিত ‘দ্য গেজেট’ পত্রিকায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য খোদ বুশকে দায়ী করে বিন লাদেনকে বেকসুর খালাস দিয়ে বাস্তবসম্মত যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন- এ কাজ বিন লাদেনকে দিয়ে সম্ভব নয়।’ বুশের অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি ইসলামকে নির্মূল করা। আর সে কারণে তার প্রথম ভাষণে ক্রুসেডের ডাক দিয়েছিলেন।
হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা চার্লিশি বলেছিলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন ভবনে ৯/১১ এর তাণ্ডব চালিয়েছে। ২০ মিনিটের স্বল্প দৈর্ঘ্য এক চলচ্চিত্রে এই হামলার অষ্টম বার্ষিকীর প্রাক্কালে এ দাবি করেন। নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য ও সোচ্চার হওয়ার জন্য মার্কিন জনগণের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে ৯/১১ এর ঘটনা ছিল একটি ষড়যন্ত্র। বিশ্বের মানুষকে এ ঘটনা দিয়ে ধোঁকা দেয়া হয়েছে। বিমানের যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের অবশ্যই শনাক্ত করা হতো।
জাতিসঙ্ঘের ৬৫তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনিজাদ বলেন- ৯/১১ একটি মিথ্যা ঘটনা। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম অজুহাত। এ হামলা ছিল গোয়েন্দা সংস্থার জটিল দৃশ্যকল্প ও কর্মকাণ্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জেন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ- নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়। এটা ছিল ভেতর থেকেই সংঘটিত। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সরকারের এ তত্ত্বকে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি। টুইন টাওয়ারের ধ্বংস্তূপ পরীক্ষায় নিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের।
লেখক : জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক
- See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/77901#sthash.moVkKRBw.dpuf

সাতশ বিশ কোটির মাত্র একজন মা, বাবাও একজন

সাতশ বিশ কোটির মাত্র একজন মা, বাবাও একজন
29 January, 2014
এই মুহুর্তে বিশ্বে জনসংখ্যা ৭২০ কোটিতে পৌছেছে। আমাদের মা-বাবা অদ্বিতীয় তার অর্থ আমরা সবাই ভাই-বোন, নিগ্রো-ককেশিয়ান এক মায়েরই সন্তান। বিশ্ব ইতিহাসে সাড়া জাগানো ডারউইনের বিপ্লবী বিবর্তনবাদের সুত্র ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করে আসছিলেন মানব জাতির পূর্বপুরুষদের এ ধরা পৃষ্ঠে আবির্ভাব হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে। বিবর্তনের ধারা হিসেবে তার অর্থ দাঁড়ায় আমাদের পূর্ব পুরুষদের সংখ্যা স্বভাবতই হবে অগনিত। বেবুন, গরিলা, শিম্পাঞ্জী, ওরাংওটাং এমনি সব প্রজাতির এক ধাপ হতে অপর ধাপে উত্তোরনের মাধ্যমে বিবর্তনের শেষ ধাপ ছিল আমাদের। তাই ধরে নেওয়া হয়েছিল আমাদের আদি মা-বাবার সংখ্যা ছিল অসংখ্য যার কারনে বলা হতো জাতিতে জাতিতে, বংশ ও গোত্রের মধ্যে কাঠামোগত, আকৃতিগত, চর্মবর্ণ, চুলের রঙ ইত্যাদিতে এত পার্থক্য। এতদিনের বিবর্তনের এসব জল্পনা কল্পনাকে ভেস্তে দিয়ে বিজ্ঞানাগারে প্রমাণিত হলো আমাদের মা-বাবা অদ্বিতীয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কী তা হলে বিবর্তনের ফসল নই? না কী ভীনগ্রহ, সেই পৌরাণিক বেহেশত থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষদের আগমন?

skullসাম্প্রতিক গবেষণায় একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে যা এএফপি, আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোর ১৯ অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, ১৮ লাখ বছরের পুরোনো একটি খুলির ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, মানুষের পূর্বসূরি আদি প্রজাতি (হোমিনিড) আসলে তিনটি নয়, বরং একটিই ছিল।

সায়েন্স সাময়িকীতে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

২০০৫ সালে জর্জিয়ার দামিনিসি প্রত্নস্থলে খুবই ভালো অবস্থায় থাকা পাঁচটি হোমিনিড খুলি উদ্ধার করা হয়। এগুলোর একটির সঙ্গে ২০০০ সালে পাওয়া একটি চোয়ালের হাড় ঠিকঠাক মিলে যায়। এতে একটি পরিপূর্ণ খুলি নিয়ে গবেষণার সুযোগ পান বিজ্ঞানীরা। ওই খুলির ধারকের মস্তিষ্কের আকার ছিল আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অ্যান্ড মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ মার্সিয়া পোন্স দো লিয়ঁ বলেন, চোয়াল জুড়ে সম্পূর্ণ করা খুলিটি হচ্ছে ওই যুগের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ করোটি।

গবেষকেরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেন, হোমিনিডের পাঁচটি খুলির গঠনে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। অথচ সেগুলো একই সময়ের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। তবে কিছু পার্থক্যের কারণে সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তাঁরা খুলিগুলোর চোয়াল, ভ্রু ও গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক পার্থক্য বিশ্লেষণ করেন। এতে সবগুলো খুলি একই প্রজাতিভুক্ত আদি প্রাণীর হতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা দেখা যায়।

বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল নিউজ উইক জানুয়ারী ১১, ১৯৮৮ সংখ্যায় ‘আদম হাওয়ার অনুসন্ধানে’ শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। (বিঃ দ্রঃ ২০০১ সালে আমি যুক্তরাষ্ট্রে মিডিয়ার একটি টকশোতে জানতে পারি ১১/১/১৯৮৮ সংখ্যার নিউজউইকের কথাটি। আমি ডাইরীতে নোট করি। স্থানীয় এক লাইব্রেরী থেকে আমি প্রবন্ধটির কপি সংগ্রহ করি)

প্রবন্ধটির মূল বক্তব্যটি ভাষান্তর করা হচ্ছেঃ

আমাদের এজমালী মাঃ “পৌরাণিক কাহিনীর বর্ণনাকারীদের উপাখ্যান এখন বিজ্ঞানীদের মৌলিক গবেষণার ফলাফলের সাথে একীভূত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই অতীতের একস্থানে অভিন্ন পূর্ব-পুরুষের অংশ ভাগ করি।” এ আবেগময় বক্তব্যটি করেছেন নিউজ উইকে প্রকাশিত নিবন্ধ ‘The Search for Adam and Eve’ – এর লেখকেরা। তারা আস্থার সাথে বলেছেন, ‘এই সময়ে কিন্তু এই প্রমাণগুলো উপস্থাপন করা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে যারা গবেষণা করেছিলেন আফ্রিকার চিড়ধরা শুষ্ক উপত্যকায় না বসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যামেরিকান ল্যাবরেটরিতে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, আমাদের সার্বজনীন মা হচ্ছেন এক মহিলা, যিনি ধরাপৃষ্ঠে দুই লাখ বছর আগে বাস করতেন এবং রেখে গেছেন ‘জিন’ যেটি মানবজাতির সবাই নিজ দেহে বহন করে চলছে। বর্তমান পৃথিবীতে যত লোক বসবাস করছে সকলেই এসেছে তার থেকে।’

আণবিক জীববিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা তল্লাশি চালিয়েছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে বিভক্ত বিভিন্ন শ্রেণীর জিনের মাঝে। আর পরীক্ষা করে তাদের মধ্য থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন একটি ডিএনএ, যেটা আমাদেরকে একজন মাত্র মহিলার দিকেই নিয়ে যায় – যার কাছ থেকে আমরা সবাই এসেছি।

আমাদের এজমালি মাকে খুজে বের করার লক্ষ্যে গবেষক রেবেকা ক্যান ১৪৭ জন গর্ভবতী মহিলাকে রাজী করান তাদের গর্ভের ফুল বিজ্ঞান কেন্দ্রে দেওয়ার জন্য। তিনি বার্কলের উইলসন ল্যাবে জীব বিজ্ঞানী মার্ক স্টোন কিং-এর সাথে কাজ করছিলেন। ক্যান বাছাই করেন কিছু আমেরিকান মহিলাকে যাদের পূর্ব পুরুষ এসেছিলেন আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া থেকে। নিউগিনি ও অস্ট্রেলিয়ায় তার সহযোগী হিসেবে যারা কাজ করছিলেন তারা খুজে পেলেন সেখানকার আদিবাসীদের। শিশুরা জন্ম নিল, গর্ভের ফুল সংগ্রহ করে হিমায়িত করা হলো এবং বার্কের উইলসন ল্যাবে বিশ্লেষণ করা হলো। ব্লেন্ডারের সাহায্যে টিস্যুগুলো পরিণত করা হলো স্যুপে। সেন্ট্রিফিউজ কোষ বিভাজন ডিটারজেন্টের সাথে মেশানো হলো, স্ফুর জ্যোতিময় দিয়ে শুকিয়া আবারো সেন্ট্রিফিউজ করা হলো। ফলে পাওয়া গেলো স্বচ্ছ তরল পদার্থ যেটা ছিলো ডিএনএ-র খাঁটি উপাদানে তৈরী। বিস্ময়কর ব্যপার যেটা নজরে পড়ল, তা হচ্ছে এই ডিএনএ সেই ডিএনএ নয় যা শিশুর দেহকোষের নিউক্লিয়াসে এবং শিশুর দৈহিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করে থাকে। এটি উত্তরাধিকার সূত্রে আসে কেবল মা থেকে,বার্কলের গবেষকগণ প্রতিটা ডিএনএ নমুনাকে টুকরো টুকরো করে কর্তন করলেন যাতে এগুলোকে অপর সব শিশুর ডিএনএ-এর সাথে তুলনা করা সম্ভব হতে পারে। যে ফল পাওয়া গেল, তাতে দেখা যায় বিভিন্ন জাতির মধ্যকার পার্থক্যটা বিস্ময়কররুপে অতি সামান্য। স্টোন কিং বলেন “বিভিন্ন জাতির মধ্যে জেনেটিক পার্থক্যটা বাস্তবিকই খুব কম হয়ে থাকে।”

নিউগেনিদের ডিএনএ তে দেখা গেল তাদের ডিএনএ অপরাপর নিউগেনিদের চেয়ে বরং আর সব এশিয়ানদের ঢের বেশি কাছের। এটা অদ্ভুত মনে হতে পারে জাতি অথবা বংশগত বাস্তব পার্থক্য সত্ত্বেও। বাস্তবে দেখা যায়, জাতিগত অনেক পার্থক্যই মূলত গতানুগতিক, নিতান্ত সাধারণ।
উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, মানুষের ত্বকের রঙ কালো হয়ে থাকে আবহাওয়ার সাথে বড় ধরণের সামঞ্জস্যতা রেখে। আফ্রিকানদের কালো রঙ সূর্যের রশ্মি প্রতিরোধের জন্য হয়ে থাকে। তেমনি ইউরোপিয়ানদের গায়ের রঙ সাদা হওয়ার কারন হচ্ছে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি শোষণ যেটা ভিটামিন ‘ডি’ তৈরিতে সাহায্য করে। ত্বকের রঙ্গের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হয় কয়েক হাজার বছরের। পক্ষান্তরে শত শত হাজার বছরের দরকার পড়ে ব্রেইন সাইজের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে। প্রতিটি শিশুর ডিএনএ গঠন শেষ পর্যন্ত মিলে যায় একজন মাত্র মহিলার সাথে। জেনেটিক উত্তরাধিকার এমন একটি বিষয় যেটা এমনকি পরিসংখ্যানবিদদের কাছেও তেমন বিস্ময়কর কিছু নয়। উইলসন ল্যাবের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘অবশ্যই একজন ভাগ্যবান মা ছিলেন।’ ইলোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডগলাস অলেস পরিচালিত গবেষণায় একদল প্রজনন বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন যোগসূত্র থেকে ধারণা করেন, দুনিয়ার প্রথম এই মহিলার আবির্ভাব হয়ে থাকবে এশিয়া মহাদেশে। বিশ্বের ৪টি মহাদেশে ৭শ’ মানুষের রক্ত থেকে সংগৃহীত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-এর উপর ভিত্তি করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌছেন। ‘ডিএনএ’ টুকরো টুকরো করে খণ্ডিত করার জন্য তারা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং সেগুলোকে বংশ তালিকায় সাজান। এই তালিকা পরিশেষে অতীতের একজন মহিলার কাছে গিয়ে থেমে যায় যিনি দেড় থেকে দু’লক্ষ বছর আগে এই ধরাপৃষ্ঠে বসবাস করতেন, তাদের হিসেবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্ম বিজ্ঞানী স্টেফন জে গোল্ডের মতে, “এটা আমাদের এই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করে যে, বিশ্বের সব মানুষ তাদের বাহ্যিক ও আকৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও একটা মাত্র সত্ত্বা থেকে এসেছে এবং মানব বংশের উৎপত্তি খুব কাছের একটি মাত্র যায়গায়। সব মানুষের মধ্যে জীবতাত্ত্বিক ভ্রাতৃত্ববোধ অনেক বেশি গভীর, যার ধারণা আগে কখনো ছিলো না।”
দৈনিক বাল্টিমোর সান পত্রিকা Geneticists Reveal Human Family Trees শিরোনামে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে। আমি এখানে তার ভাষান্তর করছি।
মানবজাতির পিতাঃ মানব দেহের জীবকোষে যে ‘Y’ – ক্রোমোজম রয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এমন সঙ্কেত পাওয়া যায় যে, গোটা মানবজাতির আদি পিতা মাত্র একজন। গবেষণার এই রিপোর্টটি উদঘাটন করেছে, আজকের প্রত্যেকটি পুরুষ যে ‘Y’ -ক্রোমোজম ধারণ করছে, তার লক্ষণ থেকে এটা স্পষ্ট এটি এসেছে একজন মাত্র পুরুষের কাছ থেকে, যিনি এ পৃথিবীতে বাস করতেন প্রায় এক লক্ষ নব্বই হাজার বছর আগে।
এ নতুন গবেষণার ফলাফল এ ধারণাটাই সমর্থন করে, আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল পৃথিবীর মাত্র একটা স্থানে। এ পুরনো ধারণা আর সঠিক নয় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের একাধিক স্থানে মানবজাতির পূর্ব পুরুষদের উদ্ভব ঘটেছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আগে বিশ্বাস করা হতো। ডারউইনের ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ অনুসারে অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়ে থাকবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে। ‘Y’ - ক্রোমোজম হচ্ছে মানব বংশানুগতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক উপাদান ‘জিন’ যে চব্বিশ প্রকার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সুতা দিয়ে গঠিত তার একটি হচ্ছে এটা একমাত্র পিতা থেকে পুত্রের দেহে সঞ্চারিত হয়। গবেষক মি. হেমার ‘Y’ - ক্রোমোজম এর অতি ক্ষুদ্র অংশের গঠনের বিশদ তুলনা করেন। সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিলো বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে লালিত ৮ জন আফ্রিকান, ২ জন অস্ট্রেলিয়ান, ৩ জন জাপানি এবং ২ জন ইউরোপীয়দের কাছ থেকে। গবেষকদের মনে যে ধারণাটি কাজ করছিল তা হলো – বিভিন্ন জাতির মধ্যে ক্রোমোজম-এর সামগ্রিক বিন্যাসের রকমফের কেমন ভিন্নরুপ গ্রহণ করে, তা পর্যবেক্ষণ করা। তারপর নির্ণয় করা, যে বৈচিত্র ধরা পড়ল তার বিবর্তনের জন্য কতটা সময়ের দরকার। যে ফল পাওয়া গেল, তাতে দেখা যায়, যত মানব সন্তান আজকের দুনিয়ায় বসবাস করছে, তাদের সকলেরই ‘Y’ – ক্রোমোজম-এর যোগসূত্র মেলে কেবলমাত্র একজন পুরুষের সাথে যিনি জীবিত ছিলেন এক লক্ষ আটাশি হাজার বছর আগে।
                                                                                                              
                                                                       -মুহাম্মাদ আলী রেজা
                             লেখকঃ সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত নিউজ লিঙ্কঃ http://www.dailynayadiganta.com/details.php?nayadiganta=NjE3OTI=&s=Nw==&c=MQ==

বুশের টুইন টাওয়ার হামলার কৌশল ও কারণ

Wednesday, September 11, 2013


বুশের টুইন টাওয়ার হামলার কৌশল ও কারণ


মুহাম্মদ আলী রেজা

ঐতিহাসিক নয়-এগারোর মহা আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিশ্ব কম্পিত হামলার নেপথ্যে যে যৌক্তিক কারণ ও কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল তার গভীর বিশ্লেষণের জন্য প্রথমেই মনোযোগ এবং দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন আমেরিকার যুগপৎ অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহের দিকে। ক্লিনটন  তখন মসনদে। আমি বাল্টিমোরে, ঘুম থেকে উঠে একদিন এক অবিশ্বাস্য নাটকীয় সংবাদ জানতে পারি। হোয়াইট হাউজে ইসলামের চাঁদ তারা পতাকা উড়ছে। ভয়ের কিছু ছিল না, কারণ আলকায়েদার জন্ম তখনো হয়নি এবং বিন লাদেনেরও পাত্তা ছিল না যিনি হোয়াইট হাউজে এসে এ ধরনের অঘটন ঘটানোর হিম্মত রাখেন। তবে সে সময় এখানকার মিডিয়ায় একটি ঝড় বয়ে যাচ্ছিল : যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। এ সময়টিতে আমি বাল্টিমোর জন্স হপকিন্সে গবেষণা করছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাল্টিমোরের হোমউড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির বেসমেন্টের ওয়ালের একটি তথ্য আমার চোখে পড়ে : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক শত হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করছে। মিডিয়ার অন্য সূত্রে জানতে পারি, এই এক লাখ নও মুসলিমের মধ্যে মহিলার সংখ্যা বেশি। পাশ্চাত্য ভাবধারায় লালিত পালিত মুক্ত হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মেয়েরা এত ঝুঁকি নিয়ে কেন ইসলামকে পছন্দ করছে যেখানে বিদ্যমান শৃঙ্খলা, আত্মসমর্পণ ও ভিন্ন রূপ হওয়ার বিধান। আমেরিকার স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সময় জনসংখ্যার বেশির ভাগ ছিল খ্রিষ্টান। এর পর ছিল ইহুদি। অন্যান্য ধর্মের লোক আনুপাতিকভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। সরকারিভাবে তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, খ্রিষ্টান ও ইহুদি এই দুই ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়ানো হবে। ক্লিনটনের  সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি সংখ্যা যেখানে ছয় মিলিয়ন ছিল সে ক্ষেত্রে মুসলমানের সংখ্যা ছয় মিলিয়ন থেকে ধীরে ধীরে সাত মিলিয়নও ছাপিয়ে যায় বলে শোনা যায়। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে হোয়াইট হাউজে তিনটি ধর্মের পতাকা উড়বে। বড় প্রশ্ন হলো : এই হারে ধর্মান্তরিত হলে এর প্রভাব তো অচিরে হোয়াইট হাউজের নির্বাচনের ওপরও পড়তে বাধ্য। মুসলমানদের ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে বা এখানকার মুসলমান অধিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব লাভের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও মন্থর গতি অনায়াসে কার্যকর করা গেলেও ধর্মান্তরিত হওয়ার এই হার বন্ধ করার তো কোনো আইনগত উপায় খোলা নেই। বছরে এক লাখ মানুষের ধর্মান্তরের এই হার যে সময়ের সাথে সাথে আরো গতি পাবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে? ভয়ঙ্কর, দানবীয় এমন কোনো ঘটনা সংঘটিত করতে হবে যাতে আমেরিকানরা  সহজে বুঝতে পারবে মুসলমানেরা তাদের এক নম্বর শত্রু, জাতি হিসেবে তারা পৈশাচিক, দানবীয়, বর্বর, ভয়ঙ্কর। কাজেই আমেরিকানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করার উপায় এটিই। এর সাথে যুক্ত হবে মিডিয়ার ব্যাপক প্রচার। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। রেডিও, টিভি, পত্রপত্রিকা, মুভি, ধারাবাহিক নাটক, টকশো, প্রেক্ষাগৃহ সর্বত্রই শুরু করে দেয়া হয় মুসলিম ও আরববিরোধী প্রপাগান্ডার তুফান, যেটি হয়ে দাঁড়ায় টুইন টাওয়ারে ভয়ঙ্কর হামলার মতোই বীভৎস। সিগ ও ওয়্যাগ দ্য ডগ এ দু’টি মুভি থিয়েটারে আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল যা ছিল খুব বেশি মুসলিমবিরোধী। এমনকি পাবলিক টিভিতে এক ঘণ্টার ডকুমেন্টারি ফিল্ম ' জিহাদ ইন আমেরিকা'  শিরোনামে দেখানো হয়। মূল কথা, মিডিয়া সুকৌশলে একটি বার্তা আমেরিকানদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নেয় যে, মুসলমানেরা সন্ত্রাসী, মুসলমান হওয়া মানে সন্ত্রাসী হওয়া এবং এই লক্ষ্যে তারা জিহাদ করছে এই ভূখণ্ডে। এসব প্রপাগান্ডা থেকে এটা সহজেই উপলব্ধি করা যায় ইসলাম ফোবিয়া ইহুদি লবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে কত বেশি প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। ২০০১ সালে নয়-এগারোতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হামলা হলেও এই একই জায়গায় প্রায় আট বছর আগে ১৯৯৩-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুসলমানেরা সন্ত্রাসী এটা প্রমাণের সূচনার মাধ্যমে নীলনকশা প্রণীত হয়। বিশ্বনন্দিত সাময়িকী রিডার্স ডাইডেস্টে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে এই বিস্ফোরণের ওপর একটি নিবন্ধে বলা হয় : বোমা হামলার জন্য এ কেন্দ্রটি বেছে নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল- এই টুইন টাওয়ারে বিশ্বের সব দেশের এবং সব জাতির লোক অবস্থান করে এবং তাদের সংখ্যা একটি শহরের লোকসংখ্যার কাছাকাছি হবে। অতএব এ কেন্দ্রে কিছু হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটি বিশ্বের সব জাতি ও দেশের এবং বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। এফবিআই পরিচালক ১৯৯৩ তে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার জন্য অভিযুক্ত করেন ওমর আবদেল রহমানের অনুসারী মুহাম্মাদ সালেহকে। পরে প্রমাণিত হয় ইসরাইলের মোসাদ অপারেটিভ এই হামলার নেপথ্য নায়ক (সূত্র : সঙ্কটাপন্ন সময়ে বিব্রতকর প্রশ্ন- জেমস এস অ্যাডাম)। সিএনএনের প্রথম রিপোর্টে স্বীকার করা হয়, যদি বোমা হামলাকারীরা বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ধ্বংস সাধনের পরিকল্পনা করত তাহলে বিস্ফোরক রাস্তার সমতলে বসাত, যার ফলে শত শত লোকের প্রাণহানি হতে পারত বা আহত হতো। বাল্টিমোর নিউট্রেন্ড পত্রিকা লেখে : বোমা হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল, যার ফলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হয়, সবচেয়ে কম লোক এর আওতায় পড়ে। অন্য দিকে আবার ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায় প্রবলভাবে সাড়া জাগানো খবরের গুরুত্ব। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আসলে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে প্রথমে হামলা ছিল একটি আগাম অভ্যন্তরীণ কৌশল, যার লক্ষ্য ছিল প্রচারমাধ্যমে স্পর্শকাতর অনুভূতি তৈরি করে মুসলমানদের সন্ত্রাসী ব্র্যান্ডে চিত্রিত ও পরিবেশিত করা এবং মুসলমানদের ব্যাপারে আমেরিকানদের সতর্ক ও উত্তেজিত করা। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হয় মিডিয়া প্রপাগান্ডা বা সন্ত্রাস। নীলনকশার শেষ বা চূড়ান্ত পর্যায়টি ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে আছড়ে পড়ল নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে দু’টি যাত্রীবাহী বিমান। অতঃপর আগুন, ধোঁয়া, তাসের ঘরের মতো দু’টি টাওয়ার ভেঙে পড়ল। এ ছবি গোটা বিশ্ব কতবার দেখেছে হিসাব নেই। যেমনটি দেখেছে পেন্টাগনের পশ্চিম অংশে আর একটি বিমান ভেঙে পড়ার স্থির চিত্র; তবে শুধু স্থির চিত্র। পেন্টাগনের ওপর বিমান ভেঙে পড়ার ভিডিও ফুটেজ বুশ প্রশাসন প্রকাশ করেনি। ‘ওপেন’ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যার সদস্যদের মধ্যে আছেন নোয়াম চমস্কি, পিট সিগার, আছেন সাংবাদিক, সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সফটওয়্যার, সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। সিএনএনের একটি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ‘ওপেন’ দাবি করেছেÑ বিমানের নাক টাওয়ারে স্পর্শের মুহূর্তেই বিশাল বিস্ফোরণ ঘটেছে ককপিটে। ওপেন-এর বক্তব্য বিমানের ককপিটে কী এমন থাকতে পারে যাতে সেখানে ওই রকম বিস্ফোরণ ঘটে। ট্রেড সেন্টারের দু’টি টাওয়ারের প্রতিটি বিমানের ধাক্কা খাবার ঠিক আগ মুহূর্তেই একই ধরনের আগুনের ঝলকানি দেখা গেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়া এরকম নিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়। বিমানে কি তা হলে ক্ষেপণাস্ত্র ছিল? যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ভেতর থেকে সংঘটিত ঘটনা। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষার পর সেখানে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। জোন্স বলেন, আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সরকারের এই তত্ত্বকে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি। কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে, নয়-এগারোর ঘটনা একটি ষড়যন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র যা বলছে তা সত্য নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন : পেন্টাগনে আসলে বিমান নয়, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কারণ বিমানের যাত্রীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কথিত বিমানের জ্যামিতিকভাবে গোলাকার মুখ সৃষ্টি কেবল কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যেই করা সম্ভব। বিশ্বের মানুষকে এ সম্পর্কে ধোঁকা দেয়া হয়েছে। যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা হতো। যাত্রীবাহী জেট বিমানের ব্লাক বক্স থেকে প্রাপ্ত ড্যাটার সাথে গণিত শাস্ত্রবিদ, ভূকম্পন বিশারদ ও ধ্বংসের ঘটনা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমতের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের দি বাল্টিমোর সান 'CIA Could be Behind 11 September Terrorist Attack' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কানাডার মন্ট্রিল থেকে প্রকাশিত দি গেজেট পত্রিকায় ডেভিড গোল্ডস্টেইন টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য খোদ প্রেসিডেন্ট বুশকে দায়ী করে বিন লাদেনকে এ অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে একাধিক বাস্তবসম্মত যুক্তি দিয়ে বলেছেন, এ কাজ কোনোভাবেই বিন লাদেনকে দিয়ে সম্ভব নয়। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্য বর্ণনায় বলেন, এ দু’টি দালান আশপাশে হেলে বা কাত হয়ে পড়ার বদলে ভেঙে নিচে দেবে গেছে। বিমানের আঘাতে ধসে পড়েছে বলে মনে হয়নি বরং মনে হয়েছে পরিকল্পিতভাবে ভবন দু’টি ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। তৃতীয় ভবনটি একইভাবে ধসে পড়েছে; কিন্তু এই ভবনে কোনো বিমান আঘাত হানেনি। আশপাশের ভবনগুলোর কোনো রকম ক্ষতি ছাড়া কিভাবে তৃতীয় ভবনটি ধসে পড়ল? পেন্টাগনে যে ভবনটি হামলা করেছিল তার ধ্বংসাবশেষের খোঁজ কেন পাওয়া গেল না বা আরোহীদের ছিন্ন ভিন্ন মৃতদেহ ও বিমানের ব্লাক বক্সের খোঁজ মিলল না কেন? ওপেন প্রশ্ন তুলেছে  গোটা বিশ্ব টিভিতে দেখেছে, গল গল করে ঘন সাদা ধোঁয়ার আস্তরণের মধ্যে ভেঙে পড়েছে ট্রেড সেন্টারের টাওয়ার; কিন্তু সাদা ধোঁয়া কেন? ওপেনের দুই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ কানাডার কারবেল ও ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজির ফ্রেডি সিম্প্যাকসান জানাচ্ছেন, বিস্ফোরকের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেড, কার্বন ও সালফারের মিশ্রণ ছিল। তা না হলে এই পরিমাণ ছাইবিহীন সাদা ধোঁয়ার জন্ম হতে পারে না। তা হলে কি দূর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণও ঘটানো হয়েছিল টাওয়ারে? ওপেন গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে পেন্টাগন বিস্ফোরণ নিয়েও। একটি অত্যাধুনিক নজরদারি ক্যামেরায় তোলা একটি ছবির প্রতিটি ফ্রেম এক সেকেন্ডের ৮০০ ভাগে ভাগ করে ওপেন দেখাচ্ছে নীল আকাশ আর তার পরেই পেন্টাগনের একটি বাহুতে বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ, ভয়াবহ আগুন; কিন্তু বিমানের কোনো চিহ্নই নেই। তা হলে বিমান ভেঙে পড়ল কোথা থেকে? নয়-এগারোর ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার দশক পূর্তির পরেও বিবিসি, রয়টার, এএফপি পরিবেশিত সংবাদ : ‘আসলে কী ঘটেছিল ২০০১-এর এই দিনে? সত্যিই কী আলকায়েদা সে দিন মার্কিন শৈর্যে আঘাত হেনেছিল নাকি সবই পাতানো। সে প্রশ্নটি রহস্যময় রয়ে গেছে আজো অনেকের কাছে।’ নাইন-ইলেভেনের কে মূল নায়ক  বুশ না লাদেন? ২০০৫ সালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি স্বীকার করেন, লাদেন কোথায় সে সম্পর্কে তারা প্রাথমিক ধারণা রাখেন; কিন্তু তাকে কৌশলগত কারণে আটক করা হচ্ছে না। তার যুক্তি ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় লাদেন জড়িত এ অভিযোগের সপক্ষে তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। আর সে জন্যই তাকে শেষে গ্রেফতার না করে অ্যাবোটাবাদ সেনানিবাসে অভিযান চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ পথ বেছে নিয়েছে কারণ লাদেনের বিচার হলে নাইন-ইলেভেনের এমন কিছু তথ্য ফাঁস হয়ে যেত, যা আমেরিকানদের জন্য সুখবর হতো না।  ক্লিনটনের  মেয়াদ শেষে জুনিয়র বুশ রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত হন। ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হন আলগোর যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রার্থী বেছে নেন কট্টর ইহুদি লিবারম্যানকে। পরিস্থিতির নাটকীয় মোড়ে জুনিয়র বুশ স্পষ্টত দেখতে পান সব ইহুদি ভোট ডেমোক্র্যাটদের পাল্লায় যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারই কোনো ইহুদি হোয়াইট হাউজের নির্বাচনে প্রার্থিতার মনোনয়ন পায়। নির্বাচনে ভরাডুবি থেকে বাঁচার তার একমাত্র উপায় অবশিষ্ট ছিল মুসলিম আমেরিকানদের ভোট। তিনিই একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যিনি সরাসরি ভোট ভিক্ষা করলেন আমেরিকান মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের অনুকূলে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা আইনে সংযোজন করা হয়েছিল সিক্রেট ইভিডেন্স আর কথিত এই ইভিডেন্সের ফাঁদে ফেলা হতো শুধু মুসলমানদের এবং তাদের বেছে বেছে জেলে ভর্তি করা হতো। বুশ আলগোরের সাথে টিভি বিতর্কে সরাসরি বললেন, তিনি জয়ী হলে সিক্রেট ইভিডেন্স আইন তুলে দেবেন। কারণ তিনি এটাকে পক্ষপাতমূলক মনে করেন। আলগোর জবাবে বলেন, তিনি এটাকে পক্ষপাতমূলক মনে করেন না। [সূত্র : লেখক তখন যুক্তরাষ্ট্রে, টিভি বিতর্ক দর্শক] অতীতে আমেরিকান মুসলিম ভোট অপরিকল্পিতভাবে দুই দলে পড়ত, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী তারা ভোট দিত; কিন্তু এবারই প্রথম মুসলমানদের ভোট এক পাল্লায় পড়ল। বুশ জয়ী হলেন, নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে ইনভেস্টরস বিজনেস ডেইলি এক নিবন্ধে লিখল : আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। বুশ ক্ষমতার মসনদে গিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে সিক্রেট ইভিডেন্স বহাল রাখেন আর হোয়াইট হাউজ নির্বাচনকে চিরতরে মুসলিম ভোট প্রভাব বলয়মুক্ত রাখার নীলনকশা হিসেবে নাইন-ইলেভেন নাটক মঞ্চস্থ করেন। মুসলিম উম্মাহর এবং আমেরিকান মুসলমানদের অবশ্য করণীয় হচ্ছে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ধারা সৃষ্টি করা।

লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

লেখাটি দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ১১/৯ তারিখে প্রকাশিত।
 নয়াদিগন্তের লিঙ্ক এখানে